সর্বপ্রথম জলপথে সমগ্র পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে যিনি ভ্রমণের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছিলেন তিনি হচ্ছেন বিশ্ববিখ্যাত পর্তুগীজ অভিযাত্রী ফার্দিনান্দ ম্যাগিলান (Ferdinand Magellan)। শোনা যায় প্রশান্ত মহাসাগর ভ্রমণকালে তিনি সেটির নামকরণ করেন mar pacific যেটি কিনা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘শান্তি প্রয়াসী সমুদ্র’ বা peaceful sea. ম্যাগিলানের জন্মস্থান সর্ম্পকে ইতিহাসবিদদের মধ্যে একটি সংশয় রয়েছে; কিন্তু অনুমান করা হয় তিনি sarbosa বা porto-র কাছে উত্তর পর্তুগালের কোনো একটি স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।
দুর্ভাগ্যবশত দশ বছর বয়সেই তিনি পিতাকে হারান। পিতার মৃত্যুর পর তিনি রানি Leonor-এর Lisbon রাজসভায় একজন সাধারণ রাজকর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পান। শৈশবেই তিনি নৌচালনা, জ্যোতির্বিদ্যা, মানচিত্র গঠন বিদ্যা প্রভৃতি বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন। ২০ বছর বয়সে ম্যাগিলান পূর্ব আফ্রিকায় যাত্রাকারী এক পর্তুগীজ নৌবহরে যোগ দেন। ম্যাগিলান এই নৌবহরে থাকাকালে diu যুদ্ধে অংশ নেন। আরব সাগরের বুকে ভয়াবহ সেই যুদ্ধে অনেক মিসরীয় জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
পরবর্তীতে ম্যাগিলান Malacca ভ্রমণ করেন, যেটি বর্তমানে Malaysia-র একটি অংশ। জানা যায়, Malacca-তে সমুদ্রবন্দর দখলের জন্য একটি যুদ্ধ হয়, এই যুদ্ধেও ম্যাগিলান অংশ নেন। ম্যাগিলান Moluccas-এও সফর করেন। Spice island হিসেবে বিখ্যাত এই স্থানটিতে ইউরোপিয়ানদের পছন্দের জায়ফল ও জয়ত্রী ছিল বেশ সস্তা ও সহজলভ্য। ম্যাগিলানের জীবনের কঠিন সময়টা আসে মরক্কোতে কাজ করতে গিয়ে। সেখানে গিয়ে তিনি পায়ে গুরুতর আঘাত পান এবং স্থায়ীভাবে খুঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করেন। এই দুঃসময়ে ম্যাগিলান দেশভক্তি এবং দেশের জন্য যে-অবদান রেখেছিলেন—নিজের দেশ থেকে তার স্বীকৃতিটুকুও পান নি। ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাঁকে Moors-দের সঙ্গে অবৈধ ব্যবসা করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়, এবং তাকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
কিছুদিন বেকার থাকার পর ম্যাগিলান ১৫১৭-এর দিকে স্পেনের Seville-এ চলে যান। ম্যাগিলান এত বির্পযয়ের পরও আত্মবিশ্বাস হারান নি; তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল—যোগ্যতাবলে তিনি স্পেনের রাজসভায় ঠিকই জায়গা করে নেবেন। এরপর তিন বছর পরিশ্রম করে অনেক নতুন মানচিত্র বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। নিজের জীবনের দুর্দশাগ্রস্ত সময় এবং ভ্রমণকালীন দুর্লভ অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে অনেক বেশি অভিজ্ঞ করে তোলে।
১৫১৯-এ স্পেনের অধিশ্বর Charles V-র সহায়তায় জলপথে সমগ্র পৃথিবী অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। তখন তাঁর সঙ্গে ছিল মাত্র ৫টি জাহাজ। প্রথমে নৌবহরটি Brazil ভ্রমণ করে, এরপর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে Patagonia পর্যন্ত যাত্রা করেন। সেইসময়ে অকস্মাৎই পূর্বপরিকল্পিতভাবে নাবিকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয় এবং এই যুদ্ধে একটি জাহাজ বিধ্বস্ত হয়। ম্যাগিলান কিন্তু হার মানলেন না; অবশিষ্ট জাহাজ ও নাবিকদের নিয়ে ফের যাত্রা শুরু করেন।
ম্যাগিলান ১৫২০ খ্রিস্টাব্দে ‘ম্যাগিলান খাল’ আবিষ্কার করেন। প্রায় চার সপ্তাহ সফরের পর আরও একটি জাহাজের সেনাপতি তাঁর জাহাজটি নিয়ে স্পেনের দিকে ফিরতি যাত্রা শুরু করে দেন। কিন্তু সেই সেনাপতি ম্যাগিলানের হাত থেকে পালাতে পারেন নি। ১৭ মার্চ তারিখে Philipine-এর homonhon দ্বীপ পর্যন্ত পৌঁছতেই ১৫০ জন নাবিকের দলসহ ম্যাগিলানের কাছে ধরা পড়েন এবং তখন একটি যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধেই ম্যাগিলান মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃতদেহটি শনাক্ত করা যায় নি।
ম্যাগিলান মারা যাবার পরও তাঁর সহযাত্রীরা যাত্রা চালিয়ে যান। অবশেষে সে-বছরের ৮ সেপ্টেম্বর সেনাপতি Juan Sebastian del যাত্রাটি সমাপ্ত করেন। এই যাত্রাটিতে প্রায় ২৩২ জন নাবিক প্রাণ দেন। এই যাত্রার বিশেষ একটি দিক হলো—এই সমুদ্রযাত্রাটির শেষে প্রমাণ হয় পৃথিবী গোলাকার।