অযোদ্ধা গ্রামের কোদলা মঠ

লেখাঃ জি.এম.এ এহসান উর রহমান

শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩

 

ঈদের লম্বা ছুটি, আমার বাকি ভ্রমণসঙ্গীরা দলে দলে বিভিন্ন দিকে গেছে, কিন্তু আমার যাওয়া হয় নি। কী আর করা, খুঁজে পেতে ঠিক করলাম যাব বাগেরহাট। খুলনার রূপসা ঘাট থেকে বাগেরহাটের বাসে উঠে পড়লাম। ঘণ্টা-দেড়েকের পথ, নামলাম ‘ষাট-গম্বুজ মসজিদ’-এর গেটে, উদ্দেশ্য বাগেরহাটের বেশ কিছু পুরাকীর্তি দেখা; যার মধ্যে আছে ‘খানজাহান আলী’ নির্মিত স্থাপত্য এবং অযোদ্ধা গ্রামের ‘কোদলা মঠ’।

 

ষাট গম্বুজ মসজিদের ভেতর দিয়ে ঢুকে পশ্চিম দিকের ছোট গেট দিয়ে বের হলে ‘ঘোড়া-দিঘি’। তার পাড় ঘেঁষে উঁচু কাঁচা রাস্তা চলে গেছে উত্তর দিকে। সে-পথ মিলিত হয়েছে চৌরাস্তায়, যার বাকি দুটি পথ পাকা আর একটি ইট বিছানো। চৌরাস্তা থেকে অযোদ্ধা গ্রাম ৬/৭ কি.মি. হবে। যেতে হবে রিকশা অথবা ভ্যানে। কোনো রিকশা না পাওয়ায় একটা ভ্যান ঠিক করলাম, ৩০ টাকা ঘণ্টা। ভ্যানচালক কায়সার একই সঙ্গে একজন ভালো ট্যুরিস্ট গাইডও। সে বাগেরহাটের প্রায় সব ঐতিহাসিক এবং বিখ্যাত স্থান চেনে। কাজেই আর চিন্তা কী, তার ওপর ভরসা করে ভ্যানে উঠে পড়লাম। 

 

শুরু হলো ভ্যান-যাত্রা। বেশ অনেকটা পথ পাকা রাস্তায় চলছি, কিছুদূর পরে রাস্তার বাঁ-দিকে গাছের আড়ালে দেখা গেল খানজাহান আলীর বসতবাড়ি। গাছে ঘেরা সরু রাস্তা দিয়ে ঢুকে পড়লাম। বিরানভূমি—চার দিকে উঁচু-নিচু কয়েকটি ঢিবি ছাড়া তেমন কিছু চোখে পড়ে না। খননকাজ চলছে। কয়েকটি স্থানে বের হয়ে এসেছে ঘরের দেওয়াল। পুরো সীমানার উত্তর কোণে আছে ‘বিষ পুকুর’, আর পূর্ব কোণে ‘আন্দি পুকুর’ ; যেখানে খানজাহান আলী ওজু করতেন। কিছুক্ষণ ঘুরে-ফিরে আবার উঠে পড়লাম ভ্যানে। রাস্তার দুপাশে রয়েছে বড় বড় গাছের সারি ; কখনও-বা রাস্তার পাশ দিয়ে চলে গেছে খাল বা ভৈরব নদীর শাখা-প্রশাখা। এককালে এই ভৈরবের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ জনপদ। আজ সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে ভৈরবও তার চলার পথ পাল্টে ঘুরে গেছে আরেক দিকে।

 

পথে যেতে যেতে একসময়ে দেখি, প্রায় পরিত্যক্ত এক জলাশয়ের পাশে একটি পাথর পোঁতা আছে। কথিত আছে যে, সেই সময়ে এখানে ছিল এক বিশাল ঘাট; যেখানে নৌকায় করে দূরদূরান্ত থেকে আনা পাথর নামানো হতো। আর সেই পাথরে গড়ে উঠেছিল সেসব প্রাচীন স্থাপত্য। পাথরের গায়ে লাল রঙের একটি প্রতিকৃতি রয়েছে। এখনও এখানে অনেকে আসেন, পুজো করেন।

 

কিছুক্ষণ পর ভ্যান এসে উঠল ইট বিছানো রাস্তায়। জায়গায় জায়গায় উঁচু-নিচু হওয়ায় বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল ভ্যান চালাতে, সেই সাথে ঝাঁকুনি। ঘণ্টাখানেক এভাবেই চলবে, জানাল কায়সার। আস্তে আস্তে সরু হতে শুরু করেছে রাস্তা আর বাড়ছে দুপাশের বসতি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা প্রবেশ করলাম অযোদ্ধা গ্রামে। আরো খানিকটা যেতেই একটা খোলা জায়গায় আবিষ্কার করলাম আমরা দাঁড়িয়ে আছি কোদলা মঠের সামনে। ১৭শ’ শতকের শেষের দিকে বারোভুঁইয়াদের একজন রাজা ‘প্রতাপ আদিত্য’ এটি নির্মাণ করেন তাঁর দরবারের এক পণ্ডিত ‘অবিলম্ব সরস্বতী’র সম্মানে। এই মঠে প্রাপ্ত মাটির ফলকের তথ্য অনুযায়ী এটি নির্মাণ করেন ‘তঢ়কা ব্রাহ্ম’ নামের এক ব্রাহ্মণ। ‘শিখারা মন্দির শ্রেণী’র গঠন-বৈশিষ্ট্যে এই মঠের সামনে রয়েছে খোলা মাঠ, যার সামনে একটি লোহার গেট।

 

রাস্তায় ভ্যান রেখে ঢুকে পড়লাম মঠে। ইট আর মাটির ফলকে তৈরি মঠটি’র বয়স ৩০০ বছরের মতো। গাঁথুনির ফাঁকে ফাঁকে জন্মেছে আগাছা। ১০ বর্গফুটের বেদি’র চারপাশ ঘিরে রয়েছে ৯ ফুট চওড়া ইটের দেওয়াল। মঠের উত্তর দিক ছাড়া বাকি তিন দিকে রয়েছে তিনটি প্রবেশদ্বার, যার মধ্যে দক্ষিণেরটি প্রধান প্রবেশপথ। প্রতিটি দ্বারে আছে ছোট গাঁথুনির নিচে কারুকাজ করা বাঁকানো প্রবেশপথ—যা মূলত ভিতরে গিয়ে গোলাকার ছাদের রূপ ধারণ করেছে। বাইরের প্রতিটি দেওয়ালের কোণগুলোতে ৫টি করে ভাঁজ রয়েছে, যার জন্য এটা কিছুটা গোলাকৃতির মনে হয়। উত্তরের দেওয়ালে দরজার উচ্চতায় রয়েছে নিপুণ টেরাকোটার কাজ। ভেতরে ছাদটি প্রায় ২০ ফুট উঁচু ও গম্বুজের মতো। বাইরে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে ক্রমশ সরু হয়ে, যার উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট।

 

এখনও বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে পূজার অনুষ্ঠান হয়, তখন দূরের গ্রাম থেকে আসেন অনেকে। দেশের বাইরের অনেক পর্যটক এখানে আসেন বলে জানালেন গাইড। পড়ন্ত বিকেলের রোদ টেরাকোটার কাজ আর ইটের ভাঁজের মাঝে যেন খেলা করছে। আরও কিছুক্ষণ এর ভিতরে আর বাইরে ঘুরে রিকশাভ্যানে উঠলাম ফিরতি পথে। বারইপাড়া বাজার রেল স্টেশনের এক ছোট কিন্তু পরিচ্ছন্ন হোটেলে দুপুরের খাওয়া সারলাম দুজনে ৫০ টাকায়। আর দু-একটি স্থান ঘুরে ছ’টা নাগাদ বাগেরহাট বাসস্ট্যান্ডে এসে গাইডকে তার পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে খুলনার বাস ধরলাম।

 

সূত্র : দৈনিক সমকাল, ২০০৭