হরিণছড়ায় নিরালা
লেখাঃ মনিরুজ্জামান সামির
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩
নিরালা নামটা হয়তো অনেকের কাছেই পরিচিত, আমি ছিলাম একদমই অপরিচিত এই নামের কোনও একটি অঞ্চলের সঙ্গে। নামটা শুনেই মনে হলো চারপাশে নেই কোনো যন্ত্রের আর্তনাদ, নেই কোলাহল, আমি শুধু একা—সাথে নিরালা। অজানার সীমানাকে ছোট্ট করার নেশা পুরনো, তাই সঙ্গী হলাম রশিক সালাউদ্দিন ভাই, লাজুক শশী, শাকিল ভট্ট, ভাবুক হুরায়রা ও বুদ্ধিদীপ্ত পল্লবদা’র। গন্তব্য শ্রীমঙ্গল উপজেলার অন্তর্গত কমলগঞ্জ থানার হরিণছড়া ও নিরালা নামক ভালো লাগার এক সবুজের হাতছানি।

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ঢাকা-শ্রীমঙ্গলগামী ট্রেনে (জয়ন্তিকা) রওনা হলাম দুপুর ২টায়। পৌঁছলাম ঠিক সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে। রাতে শ্রীমঙ্গল শহরের গ্রামীণ নামক আবাসিক হোটেলে আশ্রয় হলো। রাতের খাওয়ার পর্ব শেষ করে রুমে এসে মোটামুটি আমরা সবাই মিলে দর্শন, কাব্য, সাহিত্য, লালন সাঁইজির আধ্যাত্মিকতা, মৃত্যু ইত্যাদি ভাবনায় বাকসমরে লিপ্ত হলাম। সূত্রপাত মূলত সালাহউদ্দিন ভাই’র গুরু সুকান্ত ভট্টাচার্য’র কবিতা নিয়েই। উনি কবিতার পংক্তি ধরে ধরে বোঝাবার চেষ্টায় অবিচল। আমাকে আবৃত্তি করার সুযোগও দেন, ভাবান্তরে সহযোগিতা করে শশী, হুরায়রা, পল্লবদা, কিন্তু নিশ্চুপ শাকিল! তীব্র উত্তেজনাময় আলাপচারিতা, তর্ক ও অসমাপ্ত বিবাদ গড়াল মধ্যরাত পেরিয়ে। পরের দিনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে বিছানায় যেতেই ক্লান্ত শরীরে ঘুমের মহাকাব্য।
২০ ফেব্রুয়ারি ‘ভোরের পাখি’ শাকিলের কলতানে ঘুম ভাঙাতে হলো বিছানার মায়া ত্যাগ করে। কাছাকাছি হোটেলে নাস্তা সেরে রওনা হলাম হরিণছড়ার উদ্দেশে। যেতে হবে জীপে চড়ে। আমাদের ব্যাগ, তাঁবু ও বাজারসদাই সঙ্গী করে শুরু হলো হরিণছড়া হয়ে নিরালা যাত্রা সকাল ১১টায়। অসম্ভব সুন্দর লাগছিল চা-বাগানগুলোকে। শেড-ট্রিগুলো যেন মায়ের মতো আঁচল দিয়ে ঢেকে রেখেছে ১টি পাতা, ২টি কুঁড়ির ছোট শিশুগুলোকে। সবুজের কাছে আসব বলেই তো এত আয়োজন।

চা-বাগানের মাঝ দিয়ে পথগুলোকে মনে হচ্ছিল অলিন্দ, হৃদয়ের গহীনে, সবুজের অলিন্দে আমাদের ভালো লাগার অবগাহন। বাতাসের কোমল সৌরভ ছড়িয়ে দেয় পুরো মনের আঙিনা। ড্রাইভার রফিক বেশ মজা পাচ্ছিল মনে হয়, কেননা অনেকেই লাউয়াছড়া, মাধবকুণ্ড দেখতে যায়, কিন্তু এ-দিকটায় হরিণছড়া, নিরালায় শহুরে লোকদের আনাগোনা বেশ কম। ফাঁকে ফাঁকে জিজ্ঞেস করছিল—কিছুই তো নাই, কী দেখবেন এইখানে! ওর আসলে এইসব জায়গা দেখতে দেখতে এখন বৈচিত্র্যহীন লাগে, যা আমাদের কাছে হাজার গুণ বেশি বৈচিত্র্যময়, অজানা বিস্ময়। চা-বাগানগুলোকে পেরিয়ে যখন চা-শ্রমিকদের পল্লীঘেঁষা পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছিলাম; তখন অবাক নয়নে, হৃদয়ে ভাবছিলাম জীবন কতই না রঙের আলপনা। কারোরটা লাল, সবুজ, নীল আবার কারোর ধূসর।
হরিণছড়া পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। সাকুল্যে ৪৫ মিনিট। সালাহউদ্দিন ভাইয়ের পূর্ব পরিচিত অমায়িক পার্থদা’র বাড়িতে নেমে, বৌদির হাতের বানানো পিঠাগুলো ও সরল শিশুর উচ্ছ্বাসময় হাসি আন্তরিকতার উপমা মাত্র। আমার ও শাকিলের ভুল ভাঙ্গিয়ে জানানো হলো—যেতে হবে আরও পথ। জুলেখাপুঞ্জিতে। সমান সময়ের পথ। বিষণ্ণ ভাবনাটার সমাপ্তি হলো, কেননা এখানে এসে শুষ্ক, বিবর্ণ রূপ দেখে মনটাই খারাপ লাগছিল। পার্থদা তার অনুসন্ধিৎসু চোখে ভাবনাটা পড়তে পেরেই বলল—এখন সবুজ পাবেন কম, সবুজ আরও সবুজ হবে জুন-জুলাই মাসে। তো কি আর করা!

আশাহত পাখির নতুন স্বপ্নের তুড়ি বাজল হাস্যোজ্জ্বল, অত্যন্ত বিনয়ী, অতিথিপরায়ণ, আপন আপন খাসিয়াপল্লীতে আসামাত্র। এদের গোত্র-প্রধান (যাকে তারা মিনিস্টার বা কারবারি বলে ডাকে) ও চেয়ারম্যান সাহেবের সঙ্গে পরিচয় হলো। ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর ১:৩০/২:০০টা । জুলেখাপুঞ্জিতে মোট ১৮টি পরিবারের বাস। মূলত পান চাষের ওপর ভিত্তি করেই চলে জীবিকা। মেয়েরা তাদের মায়েদেরকে সাহায্য করছিল পানের ঝাঁপি সাজাতে। ফাল্গুন মাসের গরমটাকে ছোট করে দেখার কিছু নেই। কারবারি তার বাড়িতে আপ্যায়ন করলেন, থাকার ব্যবস্থাও হলো।
প্রায় ১০০/১২০ ফুট নিচে নেমে পানির আধার, চৌবাচ্চা। শহুরে অভ্যাসের বিপরীতে এটুকু আমাদের সয়ে গেছে কিছুটা। কোমল পানির ছোঁয়াতে শীতল হলো শরীর ও মন। আরও পুলকিত হলাম অজস্র প্রজাপতির নাচনে। এত সুন্দর কী করে হয় ওরা। নিজের অসম্ভব ভাবনাটাকে আড়াল করলাম মুচকি হেসে। ওর মতো যদি আমারও দুটি রঙিন পাখা থাকত! তাহলে ডানা ভাসিয়ে নেমে যেতাম শীতল জলের পাহাড়ি নদীতে। আহা, এদিকটায় নদীর প্রবাহ নেই, তবে ঝিরির যে-প্রবাহ থাকে তা বর্ষা ছাড়া হয়ে পড়ে শুকনো। তাই পানির কষ্টের কথা জানলাম খাসিয়াপল্লীর বাসিন্দাদের। পানি কিনে রাখতে হয়, নয়তো নিজেদের গিয়ে আনতে হয়। যা কিনা খুবই কষ্টকর। অতএব পানি ব্যবহারে সতর্ক হলাম আমরা।

পরিচয়-পর্ব গভীর হতে হতে ক্ষুধার গভীরতম অতলে হারিয়ে যাবার মুহূর্তে ডাক এল খাবার তৈরি। কারবারীর হেঁসেলে রান্না করা ডিম, ডাল, ভাত তখন অমৃত পূজন! গল্পে গল্পে সন্ধ্যারাত, তাঁবু টানানো হলো পাড়ার কাছের একটু উঁচু স্থানে। চেয়ারম্যান সাহেব আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করলেন। একটু ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব আছে এখানে। খুব কাছেই ভারতের মেঘালয়। গল্পের আসরে জানা গেল—শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মুসলিম ৫২.৭৭%, হিন্দু ৪৪.৮৭%, খ্রিস্টান ২.২১%, বৌদ্ধ ০.০৭% এবং অন্যান্য ০.০৮%। খাসিয়ারা বেশিরভাগ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী এবং একই পল্লীতে মিশ্রবর্ণ ও ধর্মের মিলিত বসবাস। আর জুলেখাপুঞ্জিতে ১৮ পরিবারের সেরকমই বসবাস। পান চাষের জন্য ১৩৫ একর জমিতে চাষাবাদ হয় বলে জানা গেল।
ছোট ছোট শিশুদের সবচেয়ে কৌতুহলী দৃষ্টির শিকার হলাম আমরা ও তাঁবুগুলো। সহজ হতে একটু সময় নিলেও ওদের ভাষার গান, জাপানিজ গান শুনিয়ে ছাড়ল। অর্থ জানতে চাইতেই মুচকি হেসে বাংলায় জানালো—আমরা গড়ব সোনালি দেশ, সত্যি হোক সুন্দর সমাবেশ। আর মিষ্টি হাসির ঝরনাধারা ভাবিয়ে তোলে, করে অভিভূত, কী যে মায়া ওদের চোখে, ভাষাহীন হয়ে যায় মুখ।

রাতের খাওয়ার পর্ব শেষ করে আরও কিছুক্ষণ গল্প, চেয়ারম্যানের মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ঘটনা, পায়ে বুলেটের আঘাতের চিহ্ন এসব চলছিল। একসময়ে চেয়ারম্যান সাহেব, কারবারি ও অন্যান্যরা বিদায় নিলেন। ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটা রাত ১২:০১ মিনিট। সোলারের সঞ্চিত উপহারে এখানে রাতে টিভি চলে, শুনতে পেলাম ‘‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি.....”। চোখ বুঁজে আসার আগে ভাবলাম, ঢাকায় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানোর ব্যস্ততা। মনে মনে শ্রদ্ধা জানালাম সহস্র শহীদের আত্মত্যাগের।
২১ ফেব্রুয়ারি, সকালে পাশের পুঞ্জিতে কথাকলি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়ে রওনা হলাম নিরালার পথে। ১০/১২ কি.মি. পথ পেছনে ফেলে আসতে সময় ব্যয় দেড় থেকে থেকে দুই ঘণ্টা। এ-পথে এসে আমার দার্জিলিঙের আঁকাবাঁকা পথের সঙ্গে তুলনা করতে ইচ্ছে করে। যদি ঐ রকম করে সাজাতে পারতাম—পাহাড়ি সবুজে ঘেরা আঁকাবাঁকা আমার এ-পথ।
নিরালায় এসে আসলেই, সত্যিকার অর্থে ভালো লাগল। সবুজের আকর্ষণ, পাতার সাথে পাতার ঘর্ষণের শব্দ। নিচে বয়ে যাওয়া ঝিরি। দুটো পাহাড়ের পরেই মেঘালয় থেকে হিমেল পাহাড়ি বাতাসের আলিঙ্গন মনকে প্রেমিক করে তুলবেই কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে। কিছু সময় কাটালাম এখানে, বিভিন্ন পরিবারের সঙ্গে পরিচয়, ফটোসেশন চলল সমান তালে। নিরালা সত্যি খুবই নিরিবিলি, শান্ত, গোছানো বাড়ি; নম্র, বিনয়ী মানুষগুলো সত্যিই অসাধারণ! মনে হয় একই সীমানায় আমরা কেন এমন, ওদের মত নই কেন? মনটা ভালো লাগার পাশাপাশি বিষণ্ণও হল। হয়, এরকম খুব বেশি ভালো লাগাটা বিষণ্ণতাকে ডাকে। আয় কাছে আয়। বেশকিছু সময় কাটিয়ে ঘুরে, ফিরে চললাম জুলেখাপুঞ্জিতে। বিকেল, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতে খাওয়ার পর্ব শেষ করে ক্যাম্প-ফায়ার সম্মুখে রেখে চলল মন খুলে হাসি, গান—‘‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি...।”
২২ ফেব্রুয়ারি, আগে থেকেই বলে রাখা জীপগাড়ি এসে হাজির, যথারীতি রওনা হলাম বিষণ্ণ বিদায় নিয়ে। খুব অল্প সময়ে ওরা আমাদেরকে এত আপন করে নেবে—ভাবতেই চোখে জল এসে যায়। ভালো থাকিস বন্ধু তুই, ভালো থাকিস কিন্তু...। শ্রীমঙ্গলে এসে হানিফ পরিবহনের বাস পেয়ে গেলাম; দুপুরের খাবার খেয়ে ৩টায় রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশে। রাতে আবার সেই অতিচেনা শহর, রফিকের অভ্যস্ত চোখে দেখা চা-বাগানের বৈচিত্র্যময়তা ও হীনতার পার্থক্য আমার চোখে ধরা দিল। আর মনে পড়ল বিশুদ্ধ হাসির ঝরনাধারা ওই শিশুদের মুখগুলো।