পুঠিয়ায় মন্দির দর্শন
লেখাঃ উদয় শংকর বিশ্বাস
শুক্রবার, ২২শে এপ্রিল, ২০২২বাংলার ইতিহাসে রাজশাহীর পুঠিয়া রাজবংশের আছে আলাদা অবস্থান। প্রাচীন এই রাজবংশের বর্তমান হালহকিতক বিশেষত এখানকার একবাংলা, জোড়াবাংলা, পঞ্চরত্ন ইত্যাদি বিভিন্ন রীতির মন্দিরগুলো দেখতে ছুটির একদিন সকালে বেরিয়ে পড়ি।
ঢাকা থেকে পুঠিয়া যেতে ঘন্টা-পাঁচেক সময় লাগে। পুঠিয়ার অবস্থান নাটোর-রাজশাহী মহাসড়কের মাঝামাঝি জায়গায়। বেলা এগারোটার দিকে পুঠিয়ায় পৌঁছই। পুঠিয়া বাজারে যাবার জন্য বাসস্ট্যাণ্ড থেকে রিকশা নিয়ে নিই। বাজার যাওয়ার আগেই মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পৌঁছে গেলাম ভুবনেশ্বর শিবমন্দিরে। বিরাট শিব-সরোবরের দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত সুউচ্চ পঞ্চরত্ন বিশিষ্ট এই মন্দিরটির গঠনশৈলী প্রথমেই নজর কাড়ল। দীঘির জলে মন্দিরের যে-অপরূপ প্রতিবিম্ব তৈরি হয়েছে সে দৃশ্য বারবার দেখার মতো।

সূত্র : ইন্টারনেট
সিঁড়ি মাড়িয়ে আস্তে আস্তে উঠে গেলাম উপরে। এর ভূমি-পরিকল্পনা, গঠনশৈলী, অলংকরণ সবকিছুতে ইন্দো-মুসলিম স্থাপত্যের পরিচয় মেলে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিবলিঙ্গটি যা পুঠিয়াশ্বর নামে পরিচিত, সেটির অবস্থান এখানে। জানা যায়, পুঠিয়া রাজবংশের বিখ্যাত রানি ভুবনময়ী দেবী তার মৃত স্বামী রাজা জগন্নারায়ণের স্মৃতি রক্ষার্থে ১৮২৩-৩০ সালের মধ্যে প্রায় তিন লক্ষ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করেছিলেন। ঐতিহাসিকেরা মন্দিরটিকে ভুবনেশ্বর মন্দির বলেন—ভারতের পুরীর স্থাপত্যরীতির সাথে মিল থাকার জন্য।
এই মন্দিরের উত্তর পাশে আছে আরেকটি মন্দির যা জগদ্ধাত্রী মন্দির বলে পরিচিত। এটির গঠনশৈলীও বেশ আকর্ষণীয়। বর্তমানে তা অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। মন্দির দুটি দেখার পর এগিয়ে গেলাম পুঠিয়াবাজারের দোলমঞ্চের দিকে। দোলমঞ্চটি পুঠিয়া রাজবাড়ির বিপরীত পার্শ্বে অবস্থিত। এটি ১৭৭৮ সালে নির্মিত। বর্গাকৃতি চারতলা বিশিষ্ট এই দোলমঞ্চটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ। এটির প্রত্যেক বাহুতে প্রথম তলায় সাতটি, দ্বিতীয় তলায় পাঁচটি, তারপর তিনটি এবং সবচেয়ে উঁচু অর্থাৎ চারতলায় একটি করে প্রবেশপথ আছে।

উদয় শংকর বিশ্বাস
একসময়ে এখানকার দোল-উৎসব বেশ আড়ম্বরপূর্ণ ছিল, ১৯৪৯ সালে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের পর থেকে এর জৌলুস কমে যায়। বর্তমানে তা বন্ধই আছে।
দোলমঞ্চের বিপরীত দিকেই আছে বিখ্যাত পাঁচআনি জমিদার বাড়িটি, যদিও একে বাড়ি না বলে রাজপ্রাসাদ বলাই ভাল। বাড়িটির সামনে বিশাল বিশাল থাম, অপরূপ এ-প্রাসাদটি ১৮৯৫ সালে রানি হেমন্ত কুমারী দেবী তার শাশুড়ি মহারানি শরৎ সুন্দরী দেবীর সম্মানে নির্মাণ করেছিলেন। পুঠিয়া রাজবংশ পাঁচআনি, চারআনি, তিনআনি এরকম বেশ কয়েক শরিকে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে পাঁচআনির প্রভাব ছিল সবার থেকে বেশি। রাজপ্রাসাদটির বর্তমান অবস্থা বেশ করুণ, পলেস্তারা খসে গিয়ে কঙ্কালসার হয়ে পড়েছে। ভগ্নপ্রায় দোতলা রাজবাড়িটির কিছু অংশ বর্তমানে ডিগ্রী কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে
|
|
বাড়িটির আঙিনায় আছে টেরাকোটা খচিত বিশাল আকৃতির পঞ্চরত্ন গোবিন্দ মন্দির। এর সাথে দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দিরের নির্মাণশৈলী ও প্রকরণগত ব্যাপক সাদৃশ্য আছে। পুরো মন্দিরটি রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী নির্ভর টেরাকোটায় আচ্ছাদিত। এখানে সকাল-সন্ধ্যা নিত্যপূজা হয়, ভোগও দেওয়া হয়। আমিও এর স্বাদ নিলাম। টেরাকোটা সমৃদ্ধ এরকম মন্দির বাংলাদেশে খুব কমই আছে। একসময়ে এই মন্দির প্রাঙ্গণে যে আরও বেশ কয়েকটি মন্দির ছিল, তার ধ্বংসাবশেষ আজও বর্তমান। এখানে অনেকক্ষণ কাটালাম। মন্দির দেখা শেষ করে গেলাম রানিঘাট দেখতে। পাকা-দেয়ালে ঘেরা রানিঘাটটি এককালে ব্যবহৃত হতো রাজবাড়ির রমণীদের স্নানের জন্য আর এখন তা ব্যবহার করছে স্থানীয় মহিলারা।
গোবিন্দ মন্দিরের পিছনে মহারানী হেমন্তকুমারীর বাসভবন সংলগ্ন রানিঘাটের কাছেই আছে অনিন্দ্য সুন্দর ছোট আহ্ণিক মন্দিরটি। বাংলাঘরের স্থাপত্য-রীতিতে নির্মিত মন্দিরটি আয়তাকার এবং এক কক্ষ বিশিষ্ট। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের দেয়াল পুরোটাই ছোট-ছোট অসংখ্য টেরাকোটা দিয়ে সাজানো। এসব টেরাকোটায় পৌরাণিক নানা কাহিনী অঙ্কিত।

এটি দেখে গেলাম পুঠিয়ার সবচেয় পুরনো সর্ব্বজয়া দুর্গা মন্দিরটি দেখতে। এটি পুরোপুরি ধবংস হয়ে গেলেও প্রাচীন কাঠামোটি অটুট আছে এখনো। স্থানীয় হিন্দুরা পুরনো মন্দিরের কাছে নতুন একটি দুর্গামন্দির তৈরি করেছেন, যা নিতান্তই বেমানান। এখানে আরও একটি মন্দির চোখে পড়ল, যা ছোট শিবমন্দির বলে স্থানীয়রা জানালেন। এই মন্দিরটি পাঁচআনি রাজবাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায় পুঠিয়া-আড়ানি সড়কের পাশে অবস্থিত। ১৮০৪ সালে তৈরি হওয়া, বর্তমানে অব্যবহৃত এই মন্দিরটির গায়ে অল্প কিছু টেরাকোটা এখনো মানুষের অত্যাচার সহ্য করে টিকে আছে। পাঁচআনিদের প্রাসাদবাড়ি ও মন্দির দেখা শেষ করে পুঠিয়াবাজারের অখ্যাত এক রেস্টুরেন্টে দুপুরের ভোজনপর্ব সেরে নিই। খানিকক্ষণ বিশ্রাম করে আবার বেরিয়ে পড়ি চারআনি জমিদারদের স্থাপনা দেখতে।
চারআনি রাজবাড়িটির অবস্থান শ্যামসরোবরের দক্ষিণ পাড়ে। এটির অবস্থা সবচেয়ে করুণ, যেন মৃতপুরী! সমস্ত বাড়িটি ভেঙে মাটির সাথে মিশে যেতে বসেছে। এখনও যা অবশিষ্ট আছে তা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এর অতীত গৌরব সম্পর্কে! সিংহদ্বারের সামনেই আছে কথিত বাঈজী বেগমের কবর। অনেক সম্পত্তি ভোগ-দখল হয়ে গেছে। বাড়িটির কিছু অংশ দখল করে তৈরি করা হয়েছে মাদ্রাসা। আর এভাবেই হারিয়ে যেতে বসেছে বাংলার গৌরবময় ইতিহাসের অংশ পুঠিয়ার চারআনি রাজাদের ঐতিহাসিক স্থাপনা।

রাজবাড়ির সামনেই আছে তাঁদের অমর কীর্তি ছোট গোবিন্দ-মন্দির, বড় আহ্ণিক মন্দির এবং জগন্নাথ-মন্দির। মন্দির তিনটি দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটি কমপ্লেক্সের মধ্যে অবস্থিত। তিনটি মন্দিরই ভিন্ন ভিন্ন স্থাপত্য-রীতিতে তৈরি। প্রথমে দেখলাম ঊনবিংশ শতাব্দীতে নির্মিত উত্তরমুখী ছোট গোবিন্দ-মন্দিরটি। এর টেরাকোটা রিলিফে যেমন রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী আছে তেমনি লতাপাতা, জালি নকশা, জ্যামিতিক নকশা আছে অনেক। সামনে দক্ষিণ দিকের সম্পূর্ণ দেয়ালটাই টেরাকোটা অঙ্কিত। মূল্যবান টেরাকোটার বড় দুটি রিলিফ কিছুদিন আগে এর গা থেকে চুরি হয়ে গেছে। ফলে মন্দিরটি এখন অনেকটাই শ্রীহীন।
|
|
|
এর পশ্চিম পার্শ্বে আছে বাংলাদেশের মন্দির-স্থাপত্যের অন্যতম স্মারক তিন কক্ষ বিশিষ্ট বড় আহ্ণিক মন্দির। এর মাঝের ঘরটি আয়তাকার দোচালা এবং পাশের ঘর দুটি বর্গাকার বিশিষ্ট—যা বাংলাদেশে আর কোথাও নেই। পুবদিকের সামনের দেয়ালে পোড়ামাটির ভগ্নপ্রায় অলঙ্করণ আছে।
এসব দেখে পূর্বদিকের জগন্নাথ মন্দির দেখতে গেলাম। দোতলা মন্দিরটি এখনও বেশ শক্ত আছে। সিঁড়ি ভেঙে উপরে গেলাম। নীরবতায় কেটে গেল কিছুক্ষণ প্রাচীন এই রাজবংশের অতীত কল্পনা করে। এ-মন্দিরের রথযাত্রা উৎসবের কথা ভেবে মন উদাস হয়ে গেল। একসময় এখানেই আষাঢ় মাসে মহা ধুমধামের সাথে পিতলের রথ টানা হতো, সেসব দিন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন পড়ে আছে শুধু মন্দিরের অবয়বটি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বর্তমানে মন্দিরগুলো সংস্কারের শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে তার কিছু চিত্র চোখে পড়ল। বিকাল গড়িয়ে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এল তা টের পেলাম না। তাই আমিও অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে পড়লাম সারা দিনের অসংখ্য স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে। ভালো লাগা মন্দ লাগার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে একসঙ্গে এতগুলো মন্দির এক জায়গায় দেখার বিরল অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে ফিরে চললাম আবার সেই কোলাহলময় ব্যস্ত রাজধানীতে।
কিভাবে যাবেন : হানিফ, ন্যাশনাল, শ্যামলী বাসে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পুঠিয়া বাজারে নেমে রিক্সা বা ভ্যানে সহজেই যাওয়া যায় পুঠিয়াবাজারে। এখানেই আছে মন্দিরগুলো। বাসভাড়া ২৫০-৪৫০। দুপুরে খাওয়ার জন্য পুঠিয়া বাসস্ট্যাণ্ডে আছে বেশ কয়েকটি হোটেল। এখানে একটি সরকারি ডাকবাংলোও আছে, যেখানে রাত্রিযাপন করা যায় অল্প টাকায় আগে থেকে অনুমতি নিয়ে।