ধামরাইয়ের শ্রীশ্রী যশোমাধবের সান্নিধ্যে একদিন
লেখাঃ চমন সিকান্দার জুলকারনাইন
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩লেখাঃ চমন সিকান্দার জুলকারনাইন
শুক্রবার, ৩১শে মার্চ, ২০২৩অনেক দিন ধরে ইচ্ছে ধামরাইতে যাওয়ার। এর কারণ বাংলাদেশের সবথেকে বড় রথ দেখা আর সেইসঙ্গে দেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া ‘লস্ট ওয়াক্স মেথডে’ তৈরিকৃত কাঁসা-পিতলের কাজের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। কাঁসা-পিতলের কাজ দেখতে যখন-তখনই ধামরাই যাওয়া যায়, কিন্তু রথযাত্রা দেখতে চাইলেই যখন-তখন যাওয়া যাবে না। কারণ তিথি, ক্ষণ মেনেই এই উৎসব হয়। ফি-বছর সারা দেশব্যাপী অসংখ্য জায়গায় রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। তবে ধামরাইয়ের রথযাত্রার আয়োজন সবথেকে বড়। দেশজুড়ে ধামরাইয়ের সুখ্যাতির মূলেও আছে শ্রীশ্রীযশোমাধবের এই রথযাত্রা।
বাঙালি হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যে-কয়েকটি উৎসব মহা ধুমধামের সঙ্গে পালন করেন তার মধ্যে আষাঢ় মাসের রথ-উৎসব অন্যতম। দেশের প্রায় সকল জনপদেই তা অনুষ্ঠিত হয় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে। হিন্দুদের উপাস্য দেবতা বিষ্ণু বা সূর্যের যাত্রা উপলক্ষে আষাঢ় মাসের দ্বিতীয়া তিথিতে হয় এই রথযাত্রা উৎসব। এই জমকালো উৎসব স্বচক্ষে দেখার জন্য বেছে নিলাম রথযাত্রার দিনটিকেই।

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম যশোমাধব দর্শনে। ঢাকা-মানিকগঞ্জ মহাসড়কের ইসলামপুর নামক বাসস্ট্যান্ডে নেমে সেখান থেকে রিকশা নিয়ে সোজা চলে যাই ধামরাই বাজারে। প্রথমে যাই নবপ্রতিষ্ঠিত রাধামাধব মন্দির দেখতে। আর এর পাশেই আছে যাত্রাবাড়ি মন্দিরটি। এই মন্দির-প্রাঙ্গণেই বসেছে শ্রীশ্রীযশোমাধবের রথমেলা। সার্কাস, পুতুলনাচ, অন্ধকূপসহ বিনোদনের হরেক আয়োজন চোখে পড়ে। রসনাবিলাসীদের জন্য আছে মিষ্টি, ফুচকা, চটপটিসহ নানা ধরনের খাবারের দোকান। মন্দির দর্শন করার সময়ে আষাঢ়ে বৃষ্টির কবলে পড়ি। তাই খানিকক্ষণ বিরতি। বৃষ্টি থামার পর এগিয়ে যাই রথখোলার দিকে। অল্প খানিকটা পথ যাওয়ার পরই দেখা পাই রাস্তার উপরে দণ্ডায়মান বিখ্যাত রথটির।
মাধব-প্রাঙ্গণে নিশ্চল অবস্থায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে যশোমাধবখ্যাত কাঠের তৈরি উঁচু রথটি। এটিকে সাজানো হচ্ছে দেখে আমি সময় নষ্ট না করে ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতলের সর্বশেষ প্রতিনিধি ‘ধামরাই মেটাল ক্রাফট’ দোকানটির দিকে এগিয়ে যাই। এককালে ধামরাইয়ের খ্যাতি ছিল কাঁসা-পিতলের জন্য। জনরুচির পরিবর্তনের কারণে এখন সে-অবস্থা আর নেই। হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্পকলাটিকে ইউরোপ-আমেরিকার শিল্পবোদ্ধাদের কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়েছেন সুকান্ত বণিক নামের একজন যুবক। ফাইন আর্টসে পড়া সুকান্ত বণিক বাপ-দাদার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাটির নবরূপায়ণ ঘটিয়েছেন। তাঁর তৈরি পৌরাণিক নানা দেবদেবীর মূর্তি দেখে শিল্পবোদ্ধারা হতবাক হয়ে যান। দেবদেবীর পাশাপাশি বিভিন্ন পশুপাখির মডেলের দেখা মেলে বণিকবাড়ির নিচতলার শো-রুমে।

দোকান থেকে বেরিয়ে বণিকবাড়ির সামনের কারুকাজখচিত শ্রীশ্রীরাধাশ্যাম জীউর মন্দির দেখতে এগিয়ে যাই। এখানে রাধাকৃষ্ণের অপরূপ যুগল মূর্তি আছে। মন্দির থেকে বেরিয়ে রাস্তা ধরে খানিকটা এগোনোর পরেই হাতের বাম পাশে চোখে পড়ে বাংলাঘরের অনুকরণে তৈরি শ্রীশ্রী বাসুদেব মন্দিরটি। এখানেও বিগ্রহ দর্শন করে সামনের দিকে আরও খানিকটা এগিয়ে যাই। হাতের ডান পাশে জয়কালী মাতার মন্দিরের দেখা পেলাম এবার। এ-মন্দিরটি বেশ পুরনো। এই মন্দিরগুলো দেখে এগিয়ে যাই যশোমাধব মন্দির দেখতে।
স্থানীয় লোকেদের সাহায্যে মিনিট দশেক হাঁটার পর কাঙ্ক্ষিত শ্রীশ্রীযশোমাধব মন্দিরটির দেখা পাই। এটি এখানকার সবথেকে পুরনো মন্দির। যশোমাধব নিয়ে অনেক জনশ্রুতি আছে। জানা যায়, পাল রাজবংশের শেষ রাজা যশোপাল অন্যান্য মন্দিরের সঙ্গে এই মন্দিরটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ঢাকা থেকে ধামরাই যাবার পথে তিনি একদিন শিমুলিয়াতে ঢিবি-সদৃশ্য একটা উঁচু জায়গা দেখেন। তিনি নির্দেশ দেন ঢিবি অনুসন্ধানের। নির্দেশানুসারে এখানে পাওয়া যায় পুরনো একটি মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ। অন্যান্য বিগ্রহের সঙ্গে মাধবের একটি অপরূপ মূর্তিলাভ হয় এখান থেকে। তাঁর নামের সঙ্গে মিল রেখে বিগ্রহের নামকরণ করা হয় যশোমাধব। যা আজ শ্রীশ্রীযশোমাধব মন্দির নামে সকলের কাছে পরিচিত।
যশোমাধব মন্দির দেখে আবার বাজারে আসি। বাজারের সাধারণ একটি হোটেলে সেরে নিই দুপুরের আহারপর্ব। পেট ঠাণ্ডা করে চলে আসি রথখোলায়। রথ টানা হবে সন্ধ্যার আগে আগে। বিকেলের দিকে সুদৃশ্য আসনে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে বসিয়ে বাদ্যবাজনা সহযোগে ধুমধামের সঙ্গে যশোমাধব মন্দির থেকে মাধব-প্রাঙ্গণে অবস্থিত রথের কাছে নিয়ে আসা হয়। এসময়ে নানা আচার পালন করা হয়। একে একে রথে ওঠানো হয় মন্দির থেকে আনা সকল বিগ্রহকে। ভক্তদের হর্ষধ্বনি ও নারীদের উলুধ্বনিতে মাধবপ্রাঙ্গণ মূহর্তে মুখরিত হয়ে ওঠে। সমগ্র উৎসব-প্রাঙ্গণ ভরে যায় জগন্নাথদেবের হাজার-হাজার ভক্তের দ্বারা। ধামরাই বাজারের পাকা সড়ক মানুষের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে।
এরপর প্রস্তুতি চলতে থাকে রথ টানার। ভক্তরা অপেক্ষা করেন চিনিবাঁধা পান ও ফুল-ফল নিয়ে। রথ টানার সময়ে এসব উপচার তাঁরা ছুঁড়ে মারেন রথকে লক্ষ্য করে। রথ টানার সময়ে সকলের এক ও অভিন্ন লক্ষ্য থাকে রথের রশি ছোঁওয়ার। তাঁদের বিশ্বাস, রথের রশি স্পর্শ করার মাধ্যমে মর্ত্যলোকের সকল পাপ থেকে তাঁরা মুক্ত হবেন। ভক্তদের এই বিশ্বাস বেশ জোরালো। রথ টানার মুহূর্তটি সবথেকে স্মরণীয়। ভক্তদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস সবার হৃদয়কেই ছুঁয়ে দেয়।

রথটিকে আস্তে আস্তে টেনে যাত্রাবাড়ি মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয় বেশ খানিকটা সময় নিয়ে। শুক্লপক্ষের দশমীর দিন অর্থাৎ উল্টো রথযাত্রার দিন এটিকে পুনরায় নিয়ে আসা হবে রথখোলার মাধব-প্রাঙ্গণে। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে ধামরাইতে বসেছে বিশাল মেলা। এই মেলা ধামরাই বাজার ছাড়িয়ে আশে-পাশে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আগে এই মেলা মাসব্যাপী হতো, বর্তমানে এর স্থায়িত্ব অনেক কম, এখন শুধু রথের দিনগুলোতেই মেলা বসে।
মেলা ও রথ-উৎসব সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য একটি কমিটি আছে, তাদের মাধ্যমেই মেলার যাবতীয় কাজ সম্পাদন হয়। সন্ধ্যার আগেই সমাপ্ত হলো রথটানা উৎসবের প্রাথমিক পর্ব। দ্বিতীয় পর্ব হবে উল্টোরথের দিন। সে-পর্ব বাকি রেখে ফিরে আসি আমার ডেরায়। আর এভাবেই কেটে যায় রথযাত্রার দিনটি।