স্টেশনে ট্রেনের প্রতীক্ষায়। রাত দুটো। অনুষ্ঠান করে বাড়ি ফেরা । ভাবছি, বেঁচে আছি কী নিয়ে? শুধু ভ্রমণ আর লেখালেখি? মনটাকে ভ্রমণের মতো করে রাখি। ভ্রমণ তখনই যখন আমি ভ্রমর। তখন ‘গুনগুন করে গেয়ে উঠি। কথাগুলো ভাবতে ভাবতে দেখি, এই যে আমার ট্রেন। কুমিল্লা স্টেশন অন্ধকারাচ্ছন্ন, যাকে বলে ঘুটঘুট্টে অন্ধকার, এরই মধ্যে অতিকায় সরীসৃপের মতো ট্রেনটি প্রায় নিঃশব্দে ঢুকে পড়ল, শত শত প্রতীক্ষারত হা-ভাতে যাত্রী বোচকাবুচকি নিয়ে ছোটাছুটি করছে। পরিপূর্ণ কামরাগুলো তন্নতন্ন করে খুঁজছে, আরো জায়গা আছে কি? 

 

নেই। দামি কামরাগুলো ভেতর থেকে ছিটকিনি আঁটা। খুলবে না, কিছুতেই নয়। ত্রাসের কারিগর ঢুকে পড়ে যদি। খদ্দরের পাঞ্জাবি, একটি ঝোলানো ব্যাগ কাঁধে, ভ্রমণের যাবতীয় তাতেই। যখন দেখছি কোথাও আর সম্ভাবনার ঠাই নেই, আল্লার নাম করে যা সামনে এলো তৃতীয় শ্রেণির ‘সুলভেই’ দেহটা গলিয়ে দিলাম কোনোমতে। পা রাখবো কোথায়? সবই তো আল্লার বান্দা, কারও পায়ে কারও শরীরে পদস্পর্শ করে কোনো রকমে একটি রেল হ্যাভেন বাগালাম। ঝুলে আছি। নিজের ওপর আস্থা অনেক বেড়ে গেল। এই প্রথম ট্রেনভর্তি লোকের কামরায় প্রবেশ করলাম যাত্রীদের ডিঙিয়ে, কাউকে আঘাত নাকরে। অন্ধকার, কিছু দেখা যায় না। কোনো সংকেত না দিয়েই যাত্রা শুরু করল রাতের ট্রেন। এখানে থেকেছেন মিনিট-খানেক হবে ।

 

আল্লার বান্দারা কীভাবে ট্রাভেল করে তা দেখার সুযোগ কোথায়? সুপার ক্লাসে ঢুকে ওদের কথা বেমালুম ভুলে আছি। সবাই কুঁকড়ে, বসে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ চার ঘণ্টায় ঢাকা পৌছুবে। একটি পা রাখলাম মস্ত বড় একটি কাপড়ের গাঁটের ওপর। আরেকটি রাখার জন্য অন্ধকারে চাপ পড়ল একটা ঘুমন্ত বান্দার। ঝটকা মেরে প্রতিবাদ জানাল: চউখে দেখেন না?

 

উত্তর দিতে ভয় পেলাম । দেখতে না পেলেও আমার কণ্ঠটি যে ওদের অনেকের পরিচিত। রাত দুটোয় তাকে আরেকবার চমকে দেব না। ট্রেন তো শহরের লোডশেডিংয়ের আওতার বাইরে । এত বড় ট্রেনটি কেন বিরতিহীন অন্ধকারে?

 

অন্ধকার বলেই তবু সহনীয়। ময়লা, অপরিষ্কার, গাদাগাদি, মালপত্তর দেখা যাচ্ছে না। এবার নারীকণ্ঠ: ‘আখাউরা আইছে? আর কদুর? পায়ে ঝিঝি ধইরা গেছে।

 

আজিজুল হক সাহেবের কথা মনে এলো । কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। বলতেন, আখাউড়া মানে জানো?

না স্যার, আমার শহরগুলোর নামের খবর আপনি জানেন । আর কেউ জানবে কী করে?

বললেন: খাউরা মানে হলো, যে খেয়েছে। খেতে ভালোবাসে অর্থাৎ খাদ্যরসিক । আর আখাউড়া মানে যে খায়নি, খাওয়া জোটেনি, নিরন্ন। সর্বহারা। উত্তরবঙ্গের ভাষায় হাউড়িয়া, নিছুলিয়া ।

 

অন্ধকার সয়ে এসেছে এতক্ষণে । অন্ধকারেও দেখা যায়, তার উপলব্ধি ।

একটি মেয়ে খুকখুক করে কাশছে । ঘোমটাটি সরায়নি । আমার মন বলল, সে বাংলার শ্যামল মেয়ে। ওমর আলী ওরই কথা লিখেছে, “যে দেশে শ্যামল রং রমণীর সুনাম শুনেছি। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, হুমায়ূন আহমেদ ওদেরকেই চট করে খুঁজে পায়। কবিতাটি মনে মনে আউড়িয়ে ভালো ‘ফিল’ করলাম।

 

মেয়েটি কষ্টে আছে। তার বমি হবে । রাত্রি জাগরণের কারণে হতে পারে অথবা অতিথি আগমনের সংকেত।

 

চলতে চলতে ট্রেনটি হঠাৎ একটি শূন্য শস্যক্ষেতের মধ্যে থেমে গেল । সামনে চলার সংকেতের অপেক্ষায়। স্বাধীন সার্বভৌম ট্রেন । যেখানে সেখানে যখন-তখন থেমে পড়ার অধিকার আছে তার। জানালা দিয়ে তাকাতে, এক চিলতে আকাশও। সুন্দর একাদশীর চাঁদ উঠেছে। যেন কাহার ভাঙা কলস আকাশ গাঙে ভাসে । ওটিও আমাদের সঙ্গে ঢাকা যাচ্ছে । খানিকক্ষণ পর পর জানান দিচ্ছে: আছি গো, আমিও আছি। আর শস্যহীন মাঠ, এত রাতেরও মানুষজন চলাচলরত ! এরই নাম: জাগ্রত বাংলাদেশ।

 

মাদ্রাসার তারেব-ই-ইলম উঠেছেন। আল্লার ঘরের জন্য চাঁদা। তার ওয়াজ উন্নত শ্রেণির। বললেন, অন্তত একটি টাকা দিয়ে, একটি আধুলি দিয়ে, একটি সিকি দিয়ে পৃথিবীর এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বেহেশতে যাবার বন্দোবস্ত পাকাপাকি করার এই শেষ সুযোগ। মাত্র একটি সিকি। কত পয়সা কত দিকে খরচ হইয়া যায়, এই বাক্সেতে ফেলিলে সতুর গুণ হইয়া যায়। তার বলার ভঙ্গি আমার চেনা রাজনীতিকদের কৌশলী বক্তৃতাকেও হার মানায় যেন। দেওয়ার মন আছে যাত্রীদের। কেউ দশ পয়সা, কেউ সিকি, কেউ আধুলি, কেউ পুরো একটি মুদ্রা, কবুল করল । বেহেশত, তুমি কত দূরে?

 

ব্যাগ থেকে দশ টাকার একটি নোট ছাড় করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলাম। তালেব মাস্টার’ টর্চ জ্বালিয়ে চাঁদার রিসিট দিতে গিয়েই বিপত্তি। চকিতে জানান হলো, আমি শ্মশ্রুধারী ব্যক্তি, তারেব মাস্টারের মতোই দেখতে।

 

সম্ভম জানিয়ে জায়গা ছেড়ে দিল একজন যুবক, নামবে টঙ্গী। আমার দুটো পা এক করে বসলাম, যেন কত দিন পর দুটি পা একসঙ্গে করতে পারলাম। পা দুটো টনটন করছিল। না, আপনি মুরুব্বী। আমার পিতার মতো।

 

যুবকটিকে আর বললাম না, তুই আমার ছোট ভাগনে রাজিনের মতো। এখানে বলতেই হয়, শুভ্র শুঞি ট্রেনে বাসে সাহায্য করে। মানুষ বয়স্কদের সম্মান দিতে শিখছে । পাস পয়েন্ট।

 

এত রাতে ফেরিঅলা? | ‘বয়েল্ড ডিম’ ‘বয়েল্ড ডিম, মিষ্টি মিষ্টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মিষ্টি। চমচম। বিরামহীন। ক্রেতাও আছে। চমচম খাওয়া মানা । শুনেই ইচ্ছা করছিল, এখানে তো আর ডাক্তার মুবিন নেই । তাহলে কি? কাল সকালেই ধরা পড়বে । ৪ থেকে ৭টায় উঠে যাবে চিনি নিয়ন্ত্রণের কাঁটাটি। পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদ।

 

ট্রেন এসে পৌঁছেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছাকাছি। আলোর প্রবেশ ঘটছে আর যাত্রীদের আরো নিকট মনে হচ্ছে। এরা আমার স্বজন, আমার আত্মীয়, আমার দেশের গ্রামীণ মানুষ। আমি যে ওদেরই গান গাই, আমি দোতরা বাজাই, আমি লিখি ওদের কথা । পাশের লাজুক মেয়েটি এবার ঘোমটা খুলে বলল।

 

‘আমি আপনাকে চিনতে পারছি। আপনি নাটক করেন, তাই না? আমি বুঝলাম, উপস্থাপনাকে ওরা নাটক বলে। কবুল করলাম । এবার ওর ভাই বলল, ‘আমার আপা না খুব ভালো গান কইতে পারে ।

 

আমি নিরুত্তর। কারণ জানি, এরপরই অপরিচয়ের সবটুকু অবগুণ্ঠন খুলে ফেলবে সে । তখন আমি আর নিজকে অন্ধকারে রাখতে পারব না । আমি পথিক। পথিকই থাকতে চেয়েছিলাম। অপরিচিত, অজানিত থাকতে ঢুকেছি এই কামরায়। বড় কামরার টিকিট তো ছিলই আমার পকেটে। বললাম: তোমার নাম? শাপিতান। ধক করে উঠল বুক। ওই নামে আমার কবিতা আছে । তুমি কি গান জানো? ‘সব গান কইতে পারি আমার বিয়া হইছে। স্বামী থাকে ইতালি গত মাসে গেছে। দোকানে কাজ করে।

 

ততক্ষণে ট্রেন অতিক্রম করেছে ভৈরবের ব্রিজ। এই ভৈরবের মেঘনাতেই মরমি কবি শেখ ভানু এসে গানের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। মেঘনা নদীতে একটি মরা লাশ ভেসে যাচ্ছিল। একটি কাক সেই মরা লাশ ঠুকরে ঠুকরে আহার সংগ্রহ করছিল, শেখ ভানুর গান: নিশীথে যাইও ফুলবনে রে ভ্রমরা।'

 

তাকিয়ে দেখি মেঘনার পানির রং, চাঁদের আলোয় ঝিলিমিলি। মনটা ভালো হয়ে গেল নিমেষেই। পাশের মেয়েটিকে আমার নিজের মেয়ের মতো মনে হলো।

 

বললাম: গাও দেখি একটা গান। আমার কানে কানে। মেয়েটি মমতাজের ভক্ত। বুকটা ফাইটা যায় গানটি নাকি তার সবচেয়ে ভালো হয়। বললাম: আরেকটি গাও। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে ধরলভালবেসে দিলি এত জ্বালা নিঠুর কালা রে সব দিয়াছি তোমায় কালা । যায় কি এখন ভোলা। আমার গাওয়া গান। ভালো করে তাকালাম ওর দিকে। কী মিষ্টি তুমি! তার মিষ্টি গলাই রুগ্‌ণ মেয়েটিকে মুহূর্তে মিষ্টি করে তুলল। কমলাপুর ঢুকে পড়েছে ট্রেন । চারদিক ফরসা। সব লোক আমার দিকে তাকিয়ে, চিনেছে । আমি তাদের লোক।

 

একটি গান না শুনে ছাড়ছি না আজ। হৈ হট্টগোলে কি আর গান হয়? গাইতে পারলাম: আর কি দেখা হবে নিরে বন্ধু তোমার সনে দিন তো যাবে নৌকা বাইয়া তোমা বিহনে ।

 

এই বগির পঞ্চাশজন যাত্রী ও শানিতার সঙ্গে দেখা হবে না কোনো দিন । শানিতাও মমতাজ হতে পারত। যাত্রাটি হুবহু ঘটেছিল। কয়েক বছর আগে। রং চড়াই নি।