লালকুঠি
লেখাঃ মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২গভর্নর জেনারেল লর্ড নর্থব্রুকের আগমন উপলক্ষ্যে ঢাকায় একটি নগর মিলনায়তন নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। হলটি নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন অভয়চন্দ্র দাস। রাজা রায় বাহাদুরের দশ হাজার টাকা ও অন্যান্য ধনাঢ্য জমিদারদের দেওয়া পাঁচ হাজার টাকা দানে হলটির নির্মাণকাজে হাত দেওয়া হয়। সম্ভবত আগস্ট ১৮৭৪ সালে ঢাকায় আগত লর্ড নর্থব্রুক এই কাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করেন। লর্ড নর্থব্রুক বাহাদুর শাহ্ পার্ক থেকে যে-রাস্তা দিয়ে এই হল কমপ্লেক্সে প্রবেশ করেন সেই রাস্তাটির নামকরণ করা হয় নর্থব্রুক হল রোড। উল্লেখ্য যে, কোম্পানির ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিদের মধ্যে নর্থব্রুকই প্রথম ঢাকায় আসেন।
১৮৭৯ সালে হলটির কাজ সম্পন্ন হলে ঢাকার কমিশনার ১৮৮০ সালের মে মাসের ২৪/২৫-এ হলটির দ্বারোদ্ঘাটন করেন। লর্ড নর্থব্রুকের নামে এর নামকরণ করা হয় ‘নর্থব্রুক হল’।
মোগল স্থাপত্যরীতির সঙ্গে ইউরোপীয় রেনেসাঁর সংমিশ্রণে নির্মিত হলটি বুড়িগঙ্গা নদী তীরবর্তী ফরাশগঞ্জে দাঁড়িয়ে আছে। হলটির আকৃতি অনেকটা অশ্বক্ষুরাকৃতির অর্ধবৃত্তাকার। এর খিলান, সুউচ্চ চূড়া, উত্তরে চারটি অষ্টভুজ মিনার ও আলঙ্কারিক নকশামণ্ডিত নিচু পাঁচিল উল্লেখযোগ্য। হল-কমপ্লেক্সে প্রবেশের জন্য উত্তর দিকে পাশাপাশি দুটি এবং দক্ষিণে একটি সদর দরজা থাকলেও বর্তমানে দক্ষিণের বুড়িগঙ্গামুখী দরজাটি বন্ধ। সম্ভবত লাল রঙের কারণে হলটি অধিক পরিচিতি পায় ‘লালকুঠি’ নামে। নির্মাণের পরে হলটি দীর্ঘদিন ঢাকার টাউন হলের চাহিদা পূরণ করে।
৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৮২ সালে নর্থব্রুক হলের সঙ্গে যুক্ত হয় একটি গণপাঠাগার। জনশ্রুতি মতে, ঢাকার নবাবেরা মাঝেমধ্যে লালকুঠিতে অবসর যাপন করতেন। তাদের বই পড়ার আসক্তিই নর্থব্রুক হল পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার প্রধান কারণ হিসেবে অনেকে চিহ্নিত করেছেন। প্রথমাবস্থায় সহস্রাধিক বই নিয়ে নর্থব্রুক হল পাঠাগারটি যাত্রা শুরু করে। ১৮৮১ সালেই এ-পাঠাগারের জন্য বিলেত থেকে বই আনা হয় বলে জানা যায়। ঢাকার নবাব খাজা আবদুল গণি এই পাঠাগারে বহু পুস্তক দান করেন। পাঠাগারটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কমিশনার ও অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য আনা হয়েছিল নবাব খাজা আবদুল গণির ব্যান্ড দলকে। প্রতিষ্ঠাকালে পাঠাগারটির পরিচালনার ভার ছিল একটি কমিটির হাতে; পদাধিকারবলে এই কমিটির প্রেসিডেন্ট হতেন ঢাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার। গবেষক কেদারনাথ মজুমদার তাঁর ঢাকার বিবরণ (১৯১০) গ্রন্থে এই পাঠাগারটিকে ঢাকার শ্র্রেষ্ঠ পাঠাগার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাঠাগারটির বেশিরভাগ বই নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানা যায়। স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে নর্থব্রুক হল সংলগ্ন জনসন ক্লাবে পাঠাগারটি স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে পাঠাগারটিতে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বই থাকলেও সকলের জন্য তা উন্মুক্ত নয়। সহজে এর অনুমতি না মেলায় গবেষকরাও এই মহামূল্যবান বইগুলো ব্যবহার করতে পারছেন না। লাইব্রেরিয়ানের একটি পদ থাকলেও, এ দায়িত্বে রত কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। দুঃখের বিষয় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এ পাঠাগারের গ্রন্থের কোনো তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল কি না তাও জানা যায় না। পাঠাগারের বই ব্যবহার করা না গেলেও যে-কেউ এসে এখানে দৈনিক পত্রিকা পড়তে পারেন। পাঠাগারটি বর্তমানে পরিচিত লালকুঠি লাইব্রেরি নামে।
নর্থব্রুক হল নির্মাণের বেশ কয়েক বছর পরে এর দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মূল হলের অনুরূপ ছোট একটি ক্লাবঘর নির্মাণ করা হয়। এই ক্লাবঘরটি ঢাকাবাসীর কাছে পরিচিত ছিল জনসন হল নামে। এই ক্লাবঘরটিতে ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য ও ইংরেজরা বিলিয়ার্ড খেলত বলে জানা যায়।
নির্মাণের পর থেকেই নর্থব্রুক হলে গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু সভা-সম্মেলনের পাশাপাশি নাটকসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও আয়োজিত হয়। প্রথমদিকে এই হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই ঢাকার নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হলেও পরবর্তীতে তার ব্যতিক্রম ঘটে।
এ হলে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ সভার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ১২ ডিসেম্বর ১৮৮০ সালে রেন্ট কমিশনারদের রেন্ট-বিলের প্রতিবাদে আয়োজিত ‘পূর্ব্ববাঙ্গালার ভূম্যধিকারি সাধারণ সভা’; নবাব আবদুল গণির স্মরণে ২৫ আগস্ট ১৮৯৬ সালে কমিশনার মি. লটমন জনসন কর্তৃক আয়োজিত শোকসভা; ২৫ জুলাই ১৮৯৮ সালে লে. গভর্নর উডবার্ন কর্তৃক নবাব খাজা আহসানউল্লাহর ইনসিগনিয়া লাভ অনুষ্ঠান; নবাব খাজা সলিমুল্লাহর উদ্দ্যোগে ১৯০২ সালে ‘পূর্ববঙ্গ রুগ্ন জমিদারসভা’কে সক্রিয় করতে আয়োজিত সভা; ঢাকার স্কুলসমূহের পরিদর্শক দীননাথ সেনের মৃত্যুতে আয়োজিত শোকসভা; কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহায্যার্থে কালীপ্রসন্ন সেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা; ২৫ জুলাই ১৯১২ সালে ঢাকার সুধীজন কর্তৃক পূর্ববঙ্গ ও আসামের গভর্নর লর্ড কারমাইকেলকে দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠান; ১৯২৪ সালে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন স্থানে ‘বৈশ্য সাহা জাতি’র প্রতি মুসলমান শ্রমিকদের প্রতিকূলাচরণ হেতু ১৬ মার্চ ‘স্বজাতি হিতসাধন সমিতি’র তত্ত্বাবধানে সিলেট ও বাঙ্গালার বিভিন্ন স্থানের প্রতিনিধি স্বজাতীয় ব্যক্তিদের সম্মেলন। ১৯০৩ সালে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী চিন্তাধারার সমর্থক লন্ডনের অধিবাসী ‘মিসেস অ্যানি বেসান্ত’ ঢাকায় এসে নর্থব্রুক হলে বক্তব্য প্রদান করেন।
১৯২৬ সালে ঢাকায় আগত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি এই হলে অভিনন্দন জানানোর আয়োজন করা হয়। এছাড়াও ১৯৭০ সালে ফরাশগঞ্জের আওয়ামী লীগের কর্মীবৃন্দের সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজিত হলেও, ঢাকায় অন্যন্য হল স্থাপনের পরে নর্থব্রুক হল তার গুরুত্ব হারাতে শুরু করে।
স্বাধীনতার পরে জনসন ক্লাবে পাঠাগারটি স্থানান্তরিত করা হলে নর্থব্রুক হলে একটি স্থায়ী নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করা হয়। নাট্যমঞ্চটি নির্মাণের পরে ১৯৭৯ সাল থেকে প্রতি বছর লালকুঠি থিয়েটার গ্রুপের উদ্যোগে বার্ষিক নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। তবে এই নাট্য প্রতিযোগিতা ১৯৮১ সালের পরে বন্ধ হয়ে যায়। তারপরে নানা সময়ে অনিয়মিতভাবে এ-মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ হয়ে থাকলেও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা না থাকায় মূলধারার নাট্যদলগুলো এখানে নাটক প্রদর্শন করতে তেমন আগ্রহী নয়।
স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়ে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অফিস গড়ে উঠেছিল নর্থব্রুক হল-চত্বর জুড়ে। পরবর্তী সময়ে এ অফিসগুলো সরিয়ে নেওয়া হলেও, বর্তমানে নর্থব্রুক হলের বাঁপাশে বহুতল ‘ফরাশগঞ্জ ক্লাব’ আর ডান পাশে ‘মঈনউদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল হল’ অনেকটাই আড়াল করে ফেলেছে নর্থব্রুক হলকে। এছাড়াও অপরিকল্পিভাবে হলের সামনে নির্মিত ফোয়ারা এবং হলটির সম্মুখভাগে সংযোজিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রগুলো নর্থব্রুক হলের আদি চেহারায় বিকৃতি ঘটেছে।