ঢাকায় ফরাসিদের একমাত্র চিহ্ন : ফরাশগঞ্জ
লেখাঃ মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২লেখাঃ মূর্শেদূল কাইয়ুম মেরাজ
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২ঢাকাই সূক্ষ্ম মসলিনের খ্যাতি বিশ্বে এতটাই ছড়িয়ে পরেছিল যে, ভাগ্য বদলের আশায় বিভিন্ন সময়ে বহু দেশের বণিক ভিড় করেছিল ঢাকায়। কেউ স্বীকার করুক বা না করুক একথা সত্য যে, ইউরোপের শিল্প-বিপ্লবের পেছনে রয়েছে ঢাকাই মসলিন থেকে অর্জিত মুনাফার বিশেষ ভূমিকা। তবে এই মসলিন বস্ত্র প্রস্তুতের পেছনে যে-কারিগরদের অক্লান্ত পরিশ্রম ছিল তা সেদিনও ছিল অজানা, আজও তা অজানাই রয়েছে। আমাদের এ-অঞ্চলের কারিগর বা শিল্পীরা কখনই পায় নি তাদের পরিশ্রমের যোগ্য সম্মানি বা মজুরি। তা সত্ত্বেও এই কারিগর বা শিল্পীরা তাদের শিল্প সৃষ্টিতে কখনো কমতি রাখে নি।
যদিও এই শিল্পগুলো থেকে উৎপাদিত মুনাফার প্রায় শতভাগই নিয়ে গেছে শাসকবর্গ বা বিদেশি বণিকেরা। মসলিন বস্ত্রের আকর্ষণে ঢাকায় আগত দেশগুলোর মধ্যে অগ্রগামী ছিল ফ্রান্স। ইংরেজদের আগমনের পরে সম্ভবত সতের শতকের আশির দশকে ফরাসিরা ঢাকায় আগমন করে।
গবেষক ড. আবদুল করিমের মতে, “১৬৮২ সালে তাদের নৌকাসমূহ সর্বপ্রথম ঢাকায় পৌঁছে এবং ১৬৯০ সালে এম. গ্রেগোরী ফরাসী বাণিজ্যকুঠির প্রধান ছিলেন।” অন্যদিকে এফ. মার্টিনের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়—“দেসলান্দের ১৬৮৯ সালে ঢাকা থেকে পণ্য ক্রয় করত, তাই তিনি ঢাকায় একটি কুঠি স্থাপন করার ইচ্ছা পোষণ করলেও, ইউরোপীয় যুদ্ধ শুরু হওয়ার কারণে তা বাস্তবায়ন হয় নি। তিনি গ্রেগোয়ের বুতেতকে ঢাকায় জমি আয়ত্ত করার জন্য পাঠালেও বুতেত তাতে ব্যর্থ হয়।”
১৭২৬ সালে ফরাসি নাগরিক ডাইরয়েস ঢাকায় একটি কুঠি স্থাপনের অনুমতি লাভ করে। অবশ্য তার পূর্বে ১৭২২ সালে ঢাকায় তাদের একটি কুঠি স্থাপনের অনুমতি দেয়া হলেও সেসময় তারা এ সুযোগটি কাজে লাগায় নি। আঠারো শতকের ত্রিশ দশকে ‘ফ্রেঞ্চ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ ঢাকার বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে। সম্রাট মোহাম্মদ শাহ-এর শাসনামলের শেষাংশে (১৭৪০-৪২) নওয়াজিশ মোহাম্মদ খান ঢাকার নায়েব নাজিম নিযুক্ত হন। সেসময় ঢাকায় আসেন ফরাসি নাগরিক মি. মেসেউর দেভেজ ও চ্যামাউজ। ১৭৪০ সালে নওয়াজিশ মোহাম্মদ খানের অনুমোদনক্রমে ফরাসিরা ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে একটি বাজার স্থাপন করে। কালক্রমে সেই বাজারটি ফরাসিদের নামে ঢাকাবাসীর কাছে পরিচিতি পায় ফ্রেঞ্চগঞ্জ বা ফরাশগঞ্জ নামে। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদী তীরের ফরাশগঞ্জ এলাকাটিই এখন ফরাসিদের আগমনের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হয়ে টিকে আছে।
১৭৫০ সালে ইংরেজ মালিকাধীন একটি কারখানা দখলের মধ্য দিয়েই ফরাশগঞ্জে ফরাসিদের বসতি স্থাপনের সূত্রপাত ঘটে। জানা যায়, ঢাকায় তাদের এ-কারখানাটির নাম ছিল ঢাকা কারখানা। মোগল শাসনামলে ফরিদপুরের জালালদির ধনাঢ্য ও প্রতাপশালী জমিদার শেখ এনায়েতুল্লাহর কাছ থেকে ফরাসিরা বুড়িগঙ্গা নদী-তীরবর্তী বর্তমান ওয়াইজঘাট সংলগ্ন বাড়িগুলো কিনে তাদের বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। ১৭৫২ সালে ফরাসিরা ভবনগুলো ক্রয় করে বলে জানা যায়; আর তেজগাঁ এলাকায় ছিল তাদের বাগানবাড়ি। পরবর্তীতে ওয়াইজ ঘাটের ফরাসিকুঠি’র স্থলেই ঢাকার নবাববাড়ি আহসান মঞ্জিল স্থাপিত হয়।
অনিরুদ্ধ রায়ের লেখা থেকে জানা যায়—“১৭৩৫ সালে ফরাসিরা ৪০,০০০ টাকার কাপড় কিনেছিল। ১৭৩৮ সালে ফরাসি সেনাপতি ডুপ্লে বাংলার নায়েব নাজিম কর্তৃক আড়াই শতাংশ হারে রপ্তানি শুল্ক প্রদানের অনুমতি লাভ করেন। পরবর্তীতে ১৭৪০ সালে তিনি ব্যবসা করে ৮ লাখ টাকার অধিক পরিমাণ লাভ করেন। তিনি ইংরেজ, ফরাসি, ওলন্দাজ বণিকদের নিয়ে কোম্পানি গঠন করে আন্তঃএশীয় বাণিজ্যে তার ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা করতেন। ১৭৪১ সালে তিনি পণ্ডিচেরী ফিরে যাবার পর বাংলার ফরাসি কুঠিয়ালরা ১৭৪৭ সালে চট্টগ্রামে একটি বাণিজ্যকুঠি স্থাপনের অনুমতি লাভ করে। সেবছরই ফরাসিরা ঢাকা থেকে প্রায় ৩ লাখ টাকার বস্ত্রাদি রপ্তানি করে।
কিন্তু পরবর্তীতে তারা এ-অঞ্চলে ব্যবসায় তেমন সুবিধা করে ওঠতে পারে নি। কিন্তু ফরাসিরা ঢাকায় তাদের দালালদের মাধ্যমে ১৭৪৬-১৭৫৫ সাল পর্যন্ত মোট ১০ বৎসরে ২৮.৫ লাখ টাকার পণ্যসামগ্রী রপ্তানি করেছিল। তারা ঢাকা থেকে মূলত সৌখিন পণ্যসামগ্রী রপ্তানির জন্য সংগ্রহ করত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—চিরুনি ও রুমাল, বিভিন্ন ধরণের মসলিন বস্ত্র—মলমল, তানজেব, নয়নসুখ, তানিসিল্ক প্রভৃতি। জানা যায়, ঢাকার নবাববাড়ি আহসান মঞ্জিলের উত্তর-পশ্চিমে গোল পুকুরটি ফরাসিদের কুঠি স্থাপনের সময় নাম ছিল ‘ল্যুস জাল্লা’।
ঢাকায় ফরাসিদের ব্যবসা ভাল জমে নি। তাদের কুঠি উঠে যায় ১৭৭৪ সালের দিকে। ১৭৬৯ সালে ফরাসি কোম্পানি বিলুপ্ত করা হয়। সেই সময় থেকে ফরাসিদের ভারতে ব্যক্তিখাতে ব্যবসা সবার জন্য অবারিত হয়। ঢাকাস্থ ফরাসিরা ১৭৭৮ সালে তাদের ফ্যাক্টরিটি ইংরেজদের কাছে সমর্পণ করেন। ইংরেজদের পক্ষে লেফটেন্যান্ট কাউই এই ফ্যাক্টরিটি গ্রহণ করেন। উনিশ শতকের সত্তর দশকে ঢাকার আরমানি জমিদার পোগোজ ‘করের’ বিনিময়ে ফরাশগঞ্জ বাজারটি ইজারা নেন। ১৮৩২ সালের এক হিসাবে দেখা যায় তখন ঢাকায় শুধু একজন ফরাসির বাস ছিল।
ফরাশগঞ্জ যে-সময়ে ফরাসিদের অধীনে ছিল সেসময় তারা এই বাজারে মশলাপাতির পাইকারি আড়ৎ গড়ে তুলেছিল। সেসময় এই বাজার ছিল মূলত কাঁচা হলুদ, আদা, রসুন, মরিচ প্রভৃতির আড়ৎ। ফরাসিরা অন্যান্য পণ্য কেনাবেচার পাশাপাশি ঢাকা থেকে মসলিন কেনা অব্যাহত রেখেছিল। ঢাকা থেকে মসলিন রপ্তানিই ছিল তাদের প্রধান ব্যবসা। ফরাসিদের প্রতিষ্ঠিত ফরাশগঞ্জ বাজারটি আজও তার প্রাচীন ঐতিহ্য মশলার আড়ৎ ধরে রেখেছে। কলেবরও বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ। তবে সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এ-বাজার ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে এলাকাটির প্রাচীন ঐতিহ্য।
বুড়িগঙ্গা নদী তীরবর্তী ফরাশগঞ্জ এলাকায় একসময় ছিল বহু প্রাচীন ও ঐতিহাসিক দালানকোঠা। বর্তমানে এসব দালানকোঠার বেশিরভাগই ভগ্নপ্রায়। ছোট-বড় বেশ কিছু জমিদার বাড়ি এখনও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই এলাকাতেই রয়েছে ডোরিক কলামে নির্মিত ভবন রূপলাল হাউজ। বর্তমানে রূপলাল হাউজের সেই পূর্ব জৌলুস আর নেই। রূপলাল হাউজের মতো এলাকাটির প্রায় জমিদার বাড়িই এখন চলে গেছে দখলদারদের কবলে।
রূপলাল হাউজ ছাড়াও এলাকাটিতে রয়েছে নর্থব্রুক হল বা লালকুঠি, মঙ্গলাবাস, মঙ্গলালয়, অক্ষয় কুমার দাশের বাড়ি, মোহিনী মোহন দাসের বাড়ি, তারক বাবুর বাড়ি, সবজি মহল, শিব মন্দির, বিহারী লাল জিউ মন্দির, বিবি-কা-রওজা, অনাথ আশ্রমসহ বহু প্রাচীন দালান-অট্টালিকা। আদি স্থাপত্যরীতি বিকৃত না করে এলাকাটির আদি ভবনগুলো যথাযথ সংরক্ষণ করা হলে পর্যটকদের কাছে এলাকাটি ঢাকার অন্যতম আকর্ষণীয় এলাকা হিসেবে পরিগণিত হবে এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।