একজন প্রকৃতি প্রেমিকের কথা
লেখাঃ চরন্তি ডেস্ক
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২প্রশ্ন : আপনার এই যে পাখিপ্রেমী হয়ে ওঠা, পর্বতারোহণের মতো আগ্রহ কিংবা ঝোঁকের জায়গাগুলো শৈশবে তৈরি হয়েছিল কি না তা দিয়ে শুরু করতে চাই।
উত্তর : আমি বরং শৈশবের একট বিষয় নিয়ে বলি। আমার বলারও আগ্রহ হয় এটা নিয়ে। আমার জন্ম গ্রামে। কিন্তু জন্মের এক বছর পরেই আমার বাবা-মা শহরে চলে আসেন। বাবার ছিল বদলির চাকরি। বাবা-মা ফরিদপুর শহরে থাকতেন। আমার বয়স যখন পাঁচ-ছয় বছর, প্রায়ই আমি জ্বরে আক্রান্ত হতাম। (সেবার) জ্বরটা কিছুতেই ছাড়ছিল না। তখনকার এক ডাক্তার বললেন, বায়ু পরিবর্তন করেন। মানে আমাকে গ্রামে যেতে বলা আরকি। আমার জন্মস্থান কুষ্টিয়ায় আমাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। গ্রামের বাড়িতে আছে আমার দাদি, এক চাচা, চাচি ও তাদের ছেলে-মেয়ে।
ওখানে আমি ছিলাম দু'বছর। আমার বাব-মা তখন শহরেই। এটা কিন্তু একটা শিশুর জন্য অসাধারণ এক সুযোগ। কর্তৃত্ব করার মতো কেউ নেই। দাদি কিইবা আর করবে! ফলে এই যে শৈশবে সাংঘাতিক একটা স্বাধীনতা পেলাম। আমার মনে হয় আমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে, গোড়ার কথা যদি খুঁজতে যাই, তাহলে মনে হয় ওই দুই বছর।
আমি যে গ্রামে বড় হয়েছি তা নয়, একেবারে স্বাধীন, কেউ খোঁজ রাখছে না। বাবা খুঁজে বেড়াচ্ছে না, বকা দিচ্ছে না, কেন সন্ধ্যায় আসিনি, কেন গায়ে কাদা—যেসবে বেশিরভাগ শিশুদের অসুবিধা থাকে। মানে নিয়ন্ত্রণহীন, একেবারে মুক্ত জীবন—পুরো দু'বছর পাওয়া! তা-ও আবার অত সুন্দর একটা গ্রামে।
আমাদের সেই এলাকায় বাঘ থাকত, শীতের বাঘ আসত, মানে চিতাবাঘ আর কি! লোকালয়ে আসত, লোকের গরু-ছাগল ধরে নিয়ে যেত, অনেকে গুলি করে মারত। এমন চমৎকার একটা গ্রামে দু'বছর বাবা-মার নাগালের বাইরে, আমার কাছে মনে হয় এই জীবনটা আমাকে প্রভাবিত করেছে। আমি মনে করি ওই দুই বছর ছিল আমার জীবনের সেরা সময়।
আমার আরেকটা ব্যাখা আছে, সেটা হলো, আমার বড় তিন বোন। অর্থাৎ আমার বাবা-মার একের পর এক মেয়ে হয়েছে। ওই সময় একটা দম্পতির কাছে এটা কতটা ভয়ঙ্কর অবস্থা চিন্তা করেন! তার পরে আমি, অর্থাৎ ছেলে হয়েছে। ফলে আমি মহামূল্যবান, মানে সোনার চেয়ে দামি! তারা তখন আমি যেন বেঁচে থাকি, এটা ছিল তাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। আমাদের যেমন সন্তানরা জজ-ব্যারিস্টার হবে এরকম আকাঙ্ক্ষা থাকে, আমার বাবা-মার তা ছিল না। তাদের একমাত্র চাওয়া ছিল, ছেলে যেন বেঁচে থাকে। মরে গেলে তো সর্বনাশ। ফলে আমার সারাজীবনে এর একটা প্রভাব পড়েছে নিশ্চয়।
আমার জীবনে কোনো বড় আকাঙ্ক্ষা কোনদিনই হয়নি। বেঁচে থাকার চেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল না। বেঁচে থাকাই সবচেয়ে মূল্যবান। বেঁচে থাকলে বাকি সব বাড়তি! হলে হলো, না হলে নয়। এটাও এক ধরনের মুক্তি। আপনার যদি বড় লক্ষ্য থাকে, যেমন আমাকে ক্লাসে প্রথম হতেই হবে, নাহলে আমার জীবন বৃথা। এটা কত বড় শৃঙ্খল গলায় দিয়েছেন ভাবুন। তাতে আপনি হয়তো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারেন, আমরা অনেক শৃঙ্খল নিজেরা ইচ্ছে করে পরে অনেক শক্তিশালী হই।
আমার সেরকম লক্ষ্য ছিল না বলে আমি কিন্তু অত শক্তিশালী নই। বেঁচে থেকে মহানন্দে আছি, মহাখুশি। বেঁচে থাকা ছাড়া কোনো লক্ষ্য নেই জীবনের। আমি যা করেছি ওগুলো সব বাড়তি। কোনো কিছু করতে গেলে তা যদি না হয়—এমন কোনো চাপ কিন্তু আমি অনুভব করি নি। আমি মনে করি, যে দুইটা জিনিস আমার শৈশব থেকে এসেছে, তার ফলে যেহেতু চাপ নেই, অনেক কিছু আপনি চাইলে গা ছেড়ে করতে পারেন। অনেক কিছু আবার গা ছেড়ে দিয়ে করলে ভালো হয়। বেশি সাবধান হয়ে করলে ভালো হয় না। এর প্রমাণ হিসেবে একটা উদাহরণ দিতে পারি। ধরুন, (মেঝের টাইলসের দিকে ইঙ্গিত করে) এই টাইলটা ধরে যদি আপনাকে হেঁটে যেতে বলি যা এক ফুট চওড়া, আপনি হেঁটে যান, কিন্তু এর বাইরে পা ফেলতে পারবেন না। আপনি তরতর করে হেঁটে যেতে পারবেন। কিন্তু এখানেই যদি একটা কাঠ উঠিয়ে দিয়ে আপনাকে হেঁটে যেতে বলি, তখন অনেক সাবধানে হাঁটতে হবে, পঞ্চাশ ফুট উপরে উঠে আপনি হাঁটতেই পারবেন না। একটা পা ফেলতে পারবেন না। কারণ আপনি বেশি সাবধান হয়ে গেছেন, আপনার শরীরটা আর কাজ করবে না। বেশি সাবধান হয়ে গেলে কিন্তু আর ভালো হয় না আসলে। একটু সাবধান ঠিক আছে, আমাদের শরীরের অনেক শক্তি তখন সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। বেশি সাবধান হলে শরীর আর কাজ করে না। ফলে আমার মনে হয় এই যে আমি গা ছেড়ে দিয়ে কিছু কিছু কাজ করেছি, ভালোই হয়েছে
প্রশ্ন : এরপর সাত বছর বয়সে তো আবার শহরে ফিরলেন?
উত্তর : হ্যাঁ, দুই বছর গ্রামে প্রাইমারি স্কুলে পড়লাম। এরপর ফিরে ফরিদপুর শহরে প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হলাম। এই শহরেই একদম বিএসসি পর্যন্ত শেষ করলাম। এরপর চাকরিতে যোগ দিয়েছিলাম। এখানে আমার একটা গল্প বলি। আমার খুব তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল স্বাধীন হওয়ার। আমার বাড়িতে একটা সুবিধা ছিল, আমি যা খুশি করতে পারতাম। আমাকে আহ্লাদ দিয়ে এমন করেছে যে আমার ওপরে কারো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আমি সবাইকে নিয়ন্ত্রণ করতাম। আমাকে আমার পরিবারে এত বেশি মূল্যবান বানিয়ে ফেলা হয় যে, আমি আমার বাবা-মা, ভাই-বোনদের ওপর অনেক অত্যাচারও করেছি। এখন আমি যদি পেছনে ফিরে তাকাই, ওগুলোকে অত্যাচার না বলে উপায় নেই। আমি যা বলতাম তা-ই হতো।
যখন কলেজে ভর্তি হয়েছি, তখন আবার আমার মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে একটা দোকান করেছি। আমি চিন্তা করেছি আমারও একটা প্রতিষ্ঠান হবে। সেখানে টিউবওয়েল বিক্রি হতো। ঢাকা থেকে মালামাল অর্ডার দিয়ে আনা হয়, বিক্রিও হয়, আমাকে দোকানে বসতেও হয় না। অন্য একজন চালায়। ফলে ওইটা চলতো বলেই কিন্তু আমি..., ফরিদপুরে চার বছর কলেজে পড়েছি। তখন বলা হতো ইন্টারমিডিয়েট, মানে এখনকার এইচ.এস.সি। ওটা পাস করেই অনেকে ঢাকায় চলে আসে। আমি আসি নি, ওই দোকানের কারণে। আমি ওইটা শেষ করেছি। আমি বি.এস.সি পাস করলাম। বাবাকে বললাম চাকরি করব, পড়ব না। বাবা খুবই হতাশ, কারণ বাড়ির বড় ছেলে যদি উচ্চশিক্ষা না পায়, তাহলে বাকিরাও উচ্ছন্নে যাবে। কিন্তু আমার তখন স্বাবলম্বী হওয়ার আগ্রহ অনেক বেশি।
প্রশ্ন : এই স্বাবলম্বী হওয়াটা তো আর আর্থিক কারণে না …
উত্তর : আর্থিক কারণেও। কারণ বাবার টাকা তো আর আমার টাকা না। আমার টাকা সেই দোকান থেকে আসে। মার কাছ থেকে দুই হাজার টাকা ধার নিয়ে আস্ত দোকান করেছি, কোনো শোধ দেই নাই। আমি তখন চাকরি খুঁজছি। তখন চাকরি পাওয়া খুবই সোজা। এখনকার দিনে সেটা চিন্তাই করা যায় না। বি.এস.সি পাশ করলে ১০টা চাকরি তখন আপনার পেছন পেছন ঘুরবে। স্কুল তখন আপনার পায়ে ধরবে, তখন তো বি.এস.সি শিক্ষক পাওয়া যেত না।
একজন জেনারেল ম্যানেজারকে চিনতাম, তিনি আমাকে বললেন, আমার পাটকলে যোগ দেন। ল্যাবরেটরিতে। আমি যোগ দিয়ে ফেললাম। বাবার কথা শুনলাম না। বাবা খুব মন খারাপ করলেন। সেজন্য বাবাকে বললাম, তোমার এম.এ. পাশ আমি করে দেব। কিন্তু আমি ঢাকায় এসে চাকরি শুরু করলাম। মহাখালীতে থাকতাম, ভোরবেলায় চলে যেতাম ডেমরায় ঢাকা জুট মিলে। সেখানে তখন আমি কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার। কোথায় আমি মহসীন হলে বসে থাকতাম ছাত্র হিসেবে, সেখানে কি না আমি কোয়ালিটি কন্ট্রোল অফিসার। পরে দেখা গেল, আমার সিদ্ধান্তটা সঠিক ছিল। ছয় মাসের মধ্যে হঠাৎ বাবা মারা গেলেন।
বাবা মারা গেছেন দুঃখ পেয়েছি, কিন্তু অসহায় তো হইনি। আমি যদি তখন মহসীন হলের ছাত্র থাকতাম, তাহলে ওনার টাকার ওপর নির্ভর করতাম। কী অবস্থা হতো আমার। এজন্যই বলি, ওই যে ছোটবেলা থেকেই আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছিল, নিজে চিন্তা করতাম, বাবা-মা যা বলত তা করতাম না, তাতে আমার ক্ষতি হয়েছে বলে আমি মনে করি না। তবে আমি যে বাবাকে কথা দিয়েছিলাম এম.এ. পাশ করব, সেটা কিন্তু আমি ভুলিনি। আমি ঠিকই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্স্ট স্ট্যান্ড করেছি। যেহেতু আমি অনেক বয়স হওয়ার পর করেছি, যেটা হয়তো ওই সময় করতাম না। যেহেতু আমি ভালো ছাত্র ছিলাম না। কিন্তু আমি কখনোই ভুলি নি—বাবাকে কথা দিয়েছিলাম। আমি এম.এ. পাশ করে দিয়েছি। বাবা কোনোদিন জানতে পারেন নি, জানলে তিনি অবাক হতেন—ও এত ভালো করল কি করে? আমি মাকে ফোন করেছিলাম। মা তো আমার অবস্থা জানেন, আমি ছিলাম মাঝারি ধরনের ছাত্র। তো মা শুনে বললেন, 'শুকুর আলহামদুলিল্লাহ্, দেশের পড়ালেখার যে কী হাল!' ওনার কোনো সন্দেহ নেই যে, আমি ফার্স্ট হওয়ার যোগ্য না। তার ধারণা, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান পড়ে গেছে বলেই আমি অমন রেজাল্ট করেছি!
প্রশ্ন : এর পরেই বোধহয় পাটকল ছেড়ে আকাশে উড়াল দেওয়ার ব্যাপারটা চলে আসে!
উত্তর : হ্যাঁ, তখন থেকেই। আমি যে পাটকলে চাকরি করতাম, ওটাই সব ছিল না। কারণ ছোটবেলা থেকেই আমার আবার একটা বাতিক ছিল, ওই গ্রামে থাকা থেকেই শুরু হয়েছে। মানে পাখি দেখা। এত পাখি চারিদিকে, সেটা খেয়াল করে দেখা; ফলে ছোটবেলা থেকেই পাখির প্রতি আমার অদম্য আকর্ষণ ছিল। আমার পুরো পরিবারেই এমন নানারকম বাতিক আছে। বিভিন্ন প্রাণী পোষার। আমার মায়ের ছিল বিড়াল। আবার পাখির সঙ্গে বিড়ালের দারুণ শত্রুতা। এসব ছিল বলেই আমার আকর্ষণটা ছিল আকাশের দিকে।
ফলে পাকিস্তান আমলে আমি পি.আই.এ.তে (পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ) এবং পাকিস্তান এয়ারফোর্সে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। দুই জায়গাতেই আমার চাকরি হয়েছিল। দুই জায়গাতেই আমি ক্যাডেট। মানে আমি ট্রেনিং নেব, এরপর আমার অফিসার হিসেবে চাকরি হবে। দুই জায়গার ট্রেনিং একই জায়গায়। তবে প্রশিক্ষণ শেষে আলাদা আলাদা কর্মস্থল। পি.আই.এ-র বেতন অনেক বেশি। কিন্তু এয়ারফোর্সে বেতন কম হলেও পদ কমিশনড অফিসার। মানে নাম আছে। প্রথম দিন থেকেই কমিশনড অফিসার। পি.আই.এ.তে যোগ দিলে কবে কি হব জানা নেই। কিন্তু টাকা আবার এখানেই বেশি।
তো আমি পি.আই.এ.র একজন বাঙালি ক্যাপ্টেন ছিলেন, তার কাছে গিয়ে ধরনা দিলাম। তিনি বললেন, দেখো আমি ২০ বছর চাকরি করে ক্যাপ্টেন হয়েছি। আমার কিন্তু করাচি এয়ারফোর্সে কোনো অফিস নেই। আমাকে বাড়ি থেকে গাড়িতে করে প্লেনে নিয়ে যায়, আমি ককপিটে বসি। এরপর পৃথিবীর নানা দেশ ঘুরে আমার ককপিট থেকে নামার পর গাড়ি দিয়ে আমাকে বাসায় নামিয়ে দেওয়া হয়। আমার অধীনে কোনো মানুষ নেই। আমি আমার ছেলেমেয়েদের ভালো করে চিনিও না, ওরা দেখতে কেমন সেটা দেখার সুযোগ হয় না। আর এয়ারফোর্সে যেদিন যোগ দিবে, কমিশনড হওয়ার দিনই তোমার অধীনে ১০০ জনকে পাবা, একটা অফিস থাকবে, অ্যাটাচড টয়লেট থাকবে। তুমি একটা বাহাদুর। এখন বলো কোনটায় যোগ দিবা? আমি ওনার পরামর্শটা বুঝেছি, উনি যেহেতু ওই চাকরটা করেছেন।
তখন আবার পাকিস্তানের রেওয়াজ ছিল, পি.আই.এ.র প্রধান সবসময় এয়ারফোর্স থেকে রিটায়ার্ড হয়ে এয়ার কমোডোর বা এয়ার ভাইস মার্শাল এরা গিয়ে হতো। তার মানে উনি নিজে কখনো প্রতিষ্ঠানে প্রধান হতে পারবেন না। এজন্যই ওই ক্যাপ্টেন ওই পরামর্শ দিয়েছিলেন। আমরা তখন তরুণ, অন্যের পরামর্শের ওপর অনেক সময় নির্ভর করি, অতকিছু তো তখন জানি না। তবে সব পরামর্শ সবসময় সঠিক হয় না, এটা আমার মনে হয় ভালোই হয়েছে।
আমিও ঠিক প্লেনের ক্যাপ্টেনের মতোই। যে নিজেই কাজ করে দক্ষ হয়, অনেকটা হার্ট সার্জনের মতো। এটাই তার গর্ব। কিন্তু অন্য জায়গায় আবার অফিসার বলতে আমরা কি বুঝি, যারা কিছুই করে না বা করতে পারে না—যে অন্যকে দিয়ে কাজ করায়। এরা দুই দলের মানুষ হয়। সব বিজ্ঞানী, সব গায়ক, ডাক্তার এরা সব নিজে কাজ করে। আবার আরেকদল মানুষ আছে, যারা কোনোকিছুই নিজে করতে চায় না, অন্যকে দিয়ে করায়। এবং অনেকে ভালোই করাতে পারে। যেমন ফিল্ম ডিরেক্টর, কিছুই করে না। যেমন স্টিভেন স্পিলবার্গ, কিছুই করে নাই, কিন্তু তাকে অস্কার দেওয়া হয়। অথচ এই ফিল্মের জন্য একজন গল্প লিখেছে, আরেকজন সাউন্ড, ক্যামেরা, অভিনয় বা অন্য কিছু অপারেট করেছে। সে শুধু করিয়েছে। ওইটাও মূল্যবান। কিন্তু তাদেরকেও আমাদের দরকার আছে। কিংবা যেমন অর্কেস্ট্রার সিম্ফনি, মানে যে লোকটা কাঠি নাড়ায়। ওই দলে আরেক ধরনের লোক থাকে। যার অন্তরের টান যেদিকে, সেদিকেই যাওয়া উচিত। আমি পেছন ফিরে তাকালে দেখি আমি বোধহয় ওই কাঠি নাড়ানো লোকটার মতোই। ভালো করতেও পারতাম না, আবার অতৃপ্তও হতাম না।
প্রশ্ন : এসব তো মুক্তিযুদ্ধের পাঁচ-সাত বছর আগের ঘটনা নাকি?
উত্তর : না অত আগের নয়, আমি যোগ দিয়েছি ১৯৬৯ সালে। ওই বছর আমি পাকিস্তানে চলে যাই, এরপর ফিরে আসি ১৯৭৩ সালের শেষে। পাঁচ বছর ওখানে ছিলাম, দুই বছর কারাগারে।
প্রশ্ন : মানে অফিস থেকে আপনাকে সরাসরি কারাগারে চলে যেতে হলো? অর্থাৎ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর?
উত্তর : হ্যাঁ যুদ্ধ শুরু হওয়ার বেশ পরে। যুদ্ধ এখন আমরা অন্তত ধরি ২৫ মার্চ রাত থেকে অর্থাৎ ২৬ মার্চ থেকে। কিন্তু (তখন) সেই যুদ্ধটা বোঝা যায় নি। দেশের বাইরে তখন কেউ যুদ্ধ বলে নাই। এখানে যারা ছিলেন তারা বুঝতে পেরেছেন যুদ্ধ চলছে। কিন্তু আমরা যারা বাইরে ছিলাম তাদের জন্য বিষয়টা তেমন ছিল না। সেখানে এটাকে একটা গোলমাল ধরা হতো। যখন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান যুদ্ধবিমান নিয়ে পালালেন, তখন আমাদের ধরা হলো। তবে বেশিরভাগ লোকের তেমন বড় কোনো অসুবিধা হয় নি। আমার একটু হয়েছিল।
আমি তখন অফিসার হিসেবেই একটা বিশেষ ট্রেনিং করছি। সেই ক্লাসে আমি এবং আরেকজন বাংলাদেশি ছিল, আব্দুল জলিল পাইকার। বাকি ২০ জন পশ্চিম পাকিস্তানের। তারাও অফিসার, আমরাও। একসঙ্গে ট্রেনিং করায় আমাদের মধ্যে একটা ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ফলে, ২৬ তারিখ সকালে একজন এসে বলে—এই কোথায় গেল তোমার মুজিব, সব তো ঠাণ্ডা করে দিয়েছি! কারণ ওখানকার খবর হলো, কয়েক মাস ধরে খুবই উৎপাত করছে এই লোকটা, তাকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে, সবকিছু এখন নিয়ন্ত্রণে। আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব—এসব কিন্তু তখন সেখানে খবর যেত যে, পূর্ব পাকিস্তানকে কিন্তু আমরা ধরতেও পারছি না, আরেকজন সরকারি লোক না, তারপরও সে যা বলছে তাই লোকে শুনছে।
তো ২৬ মার্চ সেই পাকিস্তানি অফিসার খুব আনন্দের সঙ্গে এসেছে, যে—যাক দেশের ওই অংশটা ফেরত পাওয়া গেছে। যে উৎপাত করছিল সেই লোকটাকে শায়েস্তা করা হয়েছে! তো বলল, কোথায় গেল তোমার মুজিব? আমি ওকে পট করে বলে ফেললাম যে, ঠাণ্ডা তুমি এখান থেকে মনে করছ, কিন্তু পাকিস্তানের মেজরিটি লোক কিন্তু ওখানে। চার প্রদেশের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু একটা আইন ছিল যে, ধরে নিতে হবে সব প্রদেশ সমান। এই আইনটার কথা হয়তো অনেকের জানা নেই। আমি তখন ওই অফিসারকে বললাম, আজ ২৬ মার্চ, ওখানে কিন্তু আর একজনও পাকিস্তানি নেই এবং আমার শরীরের একটা লোমও পাকিস্তানি না।
একথা বলেছি বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে। বিকেলেই আমার নামে নোটিশ এসে গেছে। আমাকে পরদিন ইনভেস্টিগেশন হবে, সেখানে থাকতে হবে। দেখলাম আমার স্কুলের কমান্ডিং অফিসারসহ আরও অনেকে বসে আছে, তারা জানতে চাইল, 'তুমি বলেছ যে তোমার শরীরের একটা লোমও নাকি পাকিস্তানি না?' আমি তো আর—না বলার প্রশ্ন আসে না। অনেক বড় অফিসাররা ছিলেন আর আমার ইচ্ছেও ছিল না। আমি বললাম যে, হ্যাঁ আমি বলেছি। এরপর আমার (মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টের) বাইরে যেতে নিষেধ করা হলো।
আমার জন্য কিছু নিয়ন্ত্রণ আগে থেকেই ছিল তা আরও বাড়ল। তবে গ্রেফতার তখনই করা হয় নি। মতিউর রহমানের ঘটনার পর আমাদের অফিসে যাওয়া বন্ধ করেছে, এরপর জেলখানায় পাঠানো হয়। সেখানে একটা দুর্গ ফাঁকা করে আমাদের ৫০০ জনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বেশিরভাগই আর্মি অফিসার, আমরা ৩০-৩৫ জন এয়ারফোর্সের। সেখানে আমাদের পুরো দলের দুই বছর কেটে গেছে। ১৯৭৩ এর নভেম্বরে আমাদের বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে দেশে ফিরলাম। এখানে পাকিস্তানের প্রায় ৯০ হাজার সেনা আর পাকিস্তানে বন্দী আমরা সাকুল্যে নয় হাজারও না। বিনিময়টা হলো কিভাবে? ওদের দশজনের বিনিময়ে আমরা একজন। তার মানে ওরা তাহলে মেনে নিল আমরা ওদের ১০ জনের সমান।
প্রশ্ন : ওই দুর্গের ২ বছর কেমন কাটল?
উত্তর : দুর্গের জীবনটা বলতে... জেলের জীবন, জেলে যারা যায় নাই তারা বুঝবে না। এটা খুবই মজার এবং আনন্দের জীবন। শুধু একটাই অসুবিধা থাকে, আপনার ভেতর গ্লানি থাকে যে, আমার জেল হয়েছে। আমাদের তো সেটা ছিল না কারো, আমরা তো কোনো অপরাধ করে জেলে যাই নি। ফলে ওই অসুবিধাটা নাই। এমনকি আমাদের জেলেও, আপনি খেয়াল করলে দেখেন লোকে কত আনন্দে আছে। কেন? কারণ তার জীবনে নানান টানাটানি নেই। এখন কোথাও যেতে হবে বা এরকম কোনো তাড়া নেই। মানে আপনাকে কোথাও যেতে হবে না। ফলে এই যে স্থির একটা মন, এটা এক ধরনের মেডিটেশন ধরে নেন। আপনার ওপর মেডিটেশন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কোথাও যেহেতু যেতে পারবেন না, ফলে আপনি যাওয়ার চিন্তাও করবেন না। দশটা জিনিস এক মুহূর্তে ভাবছেন না। যেসব ভাবনা আমরা ভাবি সেসব কিন্তু আমাদের মনের ওপর একটা বড় চাপ। ফলে আপনি দুই বছর মেডিটেশনে..., আপনি অনেকদিন মেডিটেশন করে ওইটুকুই পাবেন না যে, আমি টানাটানি থেকে মুক্ত হব। জেলখানায় এই মুক্তিটা পাওয়া যায়। যারা এসব ব্যাপার এভাবে দেখে নি তারা এটা বুঝবে না।
অনেকে বলবে, আমাকে তো আটকে ফেলা হয়েছে, বের হতে হবে, মানে একটা তাড়া কাজ করে। একেই বলে ক্লস্টোফোবিয়া। আমার ঘরে যদি সারাদিন থাকি, হঠাৎ যদি মনে হয় আমি আর বেরোতে পারব না, তখন আমার ঘাম হতে থাকে, হার্টবিট বেড়ে যায়। ওইটাকেই বলে ক্লস্টোফোবিয়া। আপনি যদি মনে না করেন যে আমাকে তো আটকে ফেলা হয়েছে, তাহলে ওইটা সুন্দর জীবন। আমার কাছে ওই দুই বছর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এবং স্মরণীয় সময়।
তখন যেটুকু লেখাপড়া করেছি তা দিয়ে আজও চালিয়ে যাচ্ছি। এখন তো লেখাপড়ার অবসর নেই। এখন আমার নানান জায়গায় যাওয়ার টান আছে। যেটা জেলখানায় ছিল না। আমরা জেলখানায় বই জুটিয়ে জুটিয়ে পড়তাম। (বইগুলো আসত কিভাবে—এমন প্রশ্নের জবাবে) সবার সঙ্গেই দুই-একটা করে বই ছিল। জেলে যেহেতু আমরা সত্যিই কয়েদি না, ফর্মালি জেল হলেও, আমাদের অন্তত একটা ট্র্যাঙ্ক নিয়ে তো ঢুকতে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের কয়েদিদের মতো কাপড় বদলাতে বলা হয় নি। আমাদের কাপড়ই আমরা পরেছি। সেইজন্য ওইভাবে নেওয়া হয়েছিল। প্রত্যকের বাক্সেই দুই-একটা বই ছিল। বাঙালি তো, বই ছাড়া যাদের জীবন কাটে না। এখন হয়তো কাটতেও পারে, তখন কাটত না। ফলে বই ছিল।
যখন ছয় মাস পার হয়ে গেল, আমরা একে অন্যের কাছ থেকে ধার করে বই পড়ছি। তখন আমার ধারণা হলো সবাই এক জায়গায় করে বই রেখে লাইব্রেরি করি, সবাই এখান থেকে নিয়ে পড়ব। আমরা তাই-ই করেছিলাম এবং সেখান থেকে অনেকে বই নিয়ে পড়ত। আমরা হাতে লিখে একটা পত্রিকা জেলখানার দেয়ালে লাগিয়ে দিতাম। আমরা বক্তৃতা করতাম, লোকে একে অন্যের থেকে কত কিছু শিখত। অনেকে আবার যারা গান জানত গানের স্কুল করেছিল, ৩০-৪০ জন ছাত্র সেখানে শিখছে। খুবই ভালো সময় গেছে। আমার মনে হয়, ওই দুই বছর যারা সেখানে ছিলেন, উপকার ছাড়া কারো অপকার হয় নি। হয়তো কিছু লোক যারা কিছুই করত না, শুধু হাই-হ্যালো করত।
আবার অনেকের অসুবিধাও ছিল। কারো হয়তো মা আছে, কারো স্ত্রীর বাচ্চা হয়েছে। আমার এক বন্ধু ছিল, খালেদ তার নাম, আর্মি অফিসার। তার দৃষ্টান্ত বললে বুঝতে পারবেন যে, এই ৫০০ জন লোকের মধ্যে নানান রকম মানসিক চাপ ছিল। আমাকে যদি একপ্রান্তে ধরেন, আরেক প্রান্তে তাহলে খালেদ। সে একদিন গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিল। এত চাপও অনেকের ওপর ছিল। সবাই যে ওখানে আরামে ছিল তা নয়। কিন্তু আমি বলছি সবকিছু নির্ভর করে আপনি বিষয়গুলোকে কীভাবে দেখছেন—তার ওপর। আপনি যদি মনে করেন, আমার তো এখানে কিছু করার নেই, সুতরাং আমি এটার সবচেয়ে সেরা—যে ব্যবহারটা করতে পারি, সেইটাই করি। সেটা একধরনের মানসিকতা।
আবার আরেক ধরনের হলো, আমার জীবন এখানে জেলেই শেষ হয়ে যাবে? দুই বছর হয়ে গেল কোনো কথাই নাই। আমাদের সরকার কি করছে? সে তখন দায়ী করতে শুরু করে যে, আমাকে কেন এখান থেকে বের করা হচ্ছে না? নিশ্চয় অমুক বা তমুক দায়ী। ফলে মন তিক্ত হয়ে যায়। ফলে এইধরনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। এমন লোকের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ঠতা ছিল না। আমরা যারা ওইখানে ছিল ঘনিষ্ঠজন, আমরা এই সময়টাকে ব্যবহার করতাম। গান গেয়ে, গান শিখিয়ে, বই পড়ে, পত্রিকা লিখে, বক্তৃতা দিয়ে। একে অন্যের থেকে কতকিছু শিখে নিয়েছি। সেইজন্য আমি মনে করি, আমার জীবনে ওইটা একটা ভালো সময় ছিল। আমার হায় হায় করার কিছুই ছিল না।
প্রশ্ন : এরপর ফিরে এসে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে যোগ দিলেন। কেমন লেগেছিল যে একধরনের আনন্দ থেকে আবার অন্য একটা প্রচলিত সময়ে আসতে?
উত্তর : হ্যাঁ, ওইটা নিঃসন্দেহে অনেক উত্তেজনার একটা মুহূর্ত। দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। আমরা কোনোদিন চিন্তাও করি নি ইস্ট পাকিস্তান (বাংলাদেশ) কোনোদিন স্বাধীন দেশ হবে। তো স্বাধীন একটা দেশ পেলাম। জীবদ্দশায় কেউ এইটা পায় নাই। খুব কম লোক পেয়েছে। পৃথিবীতে নতুন নতুন দেশ খুব একটা হয় না। ইউরোপে একসময় কয়েকটা একসঙ্গে হয়ে গেছে। কিন্তু সত্তর সালের কথা যদি ভাবেন, তার আগের ৩০ বছরে দেখুন, কোনো একটা দেশ কিন্তু নতুন করে স্বাধীন হয় নি। আমরা একসঙ্গে অনেকগুলো দেশ পেয়ে গেলাম। সাংঘাতিক বড় ব্যাপার। ফলে জীবনটাই ভিন্ন হয়ে গেল। অন্যভাবে নিজেকে, দেশকে দেখতে শুরু করলাম। খুবই আনন্দ করে আবার নতুন জীবন শুরু হলো, কোনো পিছুটান ছিল না।
প্রশ্ন : আপনার এই যে যেকোনো সময়কে সেই সময়ের মতো করে উপভোগ করার দর্শন, এটা কি আপনার খুব কম বয়সেই এসেছে, কারণ আপনি যে ঘটনামালা বললেন, প্রচলিত অর্থে আপনি তখন খুব বড় কেউ না বয়সের দিক থেকে। আপনি বললেন যে, জেল-জীবনটা আপনি যেভাবে উপভোগ করেছেন, তখন যে জীবনদর্শন কাজ করছিল, কেন যেন মনে হয় আপনি পুরো জীবনটা ওই দর্শনেই কাটাচ্ছেন। সেই জীবনদর্শনটা কি আপনার ভেতরে খুব কম বয়সেই তৈরি হয়েছিল?
উত্তর : এটা দর্শন বলব কি না জানি না। আমি বলব এটা একটা জীবনের ভঙ্গী। জীবন চলার একটা ধারা। সেটা তো আমার ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়েছিল। আমার অন্য গল্পেও আপনি দেখতে পাবেন আমি মহাখুশি একজন মানুষ। এরকমই আমার জীবন গেছে। আমি মাঝে মাঝে মনে করি যে আমার ভেতরে এটার একটা অভাব আছে। আমি সত্যিই কোনোদিন দুঃখ পাইনি। আমার সব কষ্টে অন্যে কষ্ট পাচ্ছে, সেটাই আমার কষ্ট।
আমি নিজে এত বছরে কোনোদিন কষ্ট পেলাম না, সেজন্য মনে হয়—আমি বোধহয় কিছু হারালাম। আমার মনে হয় আমার অনুভূতিটাই হয়তো অমন তীব্র না, কষ্ট পাই না। আমি কষ্ট পেয়েছি আরেকজন যেমন আমার বন্ধু, আমার মা, ভাই কিংবা বোন মারা গেলেন এইধরনের কিছু। নিজের জন্য কখনো কষ্ট পাই নি। এটা এজন্য হতে পারে যে, এইটা আমার একটা ভঙ্গী হয়ে গেছে, অভ্যাস হয়ে গেছে। আবার এটা একটা ক্ষমতাও বলতে পারেন। দর্শন পর্যন্ত আসলে পৌঁছাতে দেয় না।
প্রশ্ন : ৭৩ সালের পরে ৭৪-৭৫ সময়টায় আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটা অস্থিরতা গেছে, আপনি নিজে যেহেতু বিমান বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ওই সময়টা কেমন গেছে? সেই সময়ের স্মৃতিচারণ কি করবেন আমাদের সাথে?
উত্তর : হুঁ অবশ্যই। আমি তো ৭৩-এর শেষে এলাম। ৭৪-এ একটা নতুন দেশে গর্বের সঙ্গে এলাম। তখন আমি স্বাধীন দেশের মানুষ। কিন্তু এসে দেশের অবস্থা পেলাম এরকম, তাতে কিন্তু কষ্ট পেয়েছি। আমি বিরাট প্রত্যাশা করি নি, কিন্তু অত খারাপ সেটাও কল্পনা করি নি। দেশের অর্থনীতির অবস্থা তখন চরম খারাপ। আমরা কখনোই অত ভালো ছিলাম না, কিন্তু অত খারাপ! দেশের অর্থনীতি তো তখন ভেঙে পড়েছিল। ভেঙে পড়ারই কথা, কিন্তু আমার মনে খুব কষ্ট দিয়েছে এটা।
পঁচাত্তর সালে এসে মানুষ মরতে শুরু করল। আমি নিজে দেখেছি ওটা, খুবই কষ্টের—যে আমি ফার্মগেট পর্যন্ত হেঁটে যাচ্ছি, লোক মরে পড়ে আছে। আপনারা হয়ত ওটা জানেন না, কিন্তু একটা মন্বন্তর শুরু হয়েছিল। ওই সময় রংপুরে মঙ্গা শুরু হলো, অনেক জায়গায় লঙ্গরখানা খোলা হলো, ঢাকাতেও কিন্তু রাস্তার মোড়ে মোড়ে মরে পড়ে ছিল। আমি এসব দেখেছি এবং দেশের সরকারের বিরুদ্ধে তখন চরম ঘৃণা! একই সরকার কিন্তু, যারা দেশ স্বাধীন করেছে তাদের বিরুদ্ধেই। এখন আমরা এসব ভুলে গেছি, ভুলে যাওয়াই হয়তো ভালো। কিন্তু ছিল, এটাও আমায় বাড়তি কষ্ট দিত।
এরপর তো এল একদলীয় শাসন। সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো এক দল থাকবে, সবাই ভোট দেবে। হঠাৎ সেই পদ্ধতি আমাদের দেশে চালু করা হলো, সেগুলো ভয়ঙ্কর ছিল। আমাদের কেউ ব্যক্তিগতভাবে এমন কিছু চাই নি, কিন্তু বাহিনীর প্রধানদের সম্মতি দিতে হয়েছিল। যে-মানুষ গণতন্ত্রের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করল, তা তো মেকি সংগ্রাম ছিল না, আমরা জানি তার জীবন সম্পর্কে। এবং শেষ পর্যন্ত তার জীবনে চরম সাফল্য এল। একটা স্বাধীন দেশ হলো তার নেতৃত্বে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এভাবে ফিরে যাওয়া কেন, কোন কাজে? আপনি, অর্থনীতি ভেঙে গেছে এটাকে সোজা করব—সেকথা মনে করালেও এটার ব্যাখ্যাটা যথেষ্ট নয়। এটা এমন না যে, এখন আমাদের গণতন্ত্রের সময় নয়, আমাদের এখন দেশ গড়ে তুলতে হবে। সব একনায়ক কিন্তু তাই-ই বলে। আসলে সে সেটা বিশ্বাসও করে। গণতন্ত্র থাকলে তো কোনোদিন দ্রুত এগুনো যায় না, গণতন্ত্র মানেই ভিন্নমত। আপনি একটা কথা বললেন, আমি বললাম ভিন্ন কথা। ফলে আপনি যতটুকু যেতে চাইলেন –না হবে না। সেটা ব্যাবসায়ীক প্রতিষ্ঠানেও হয় দেখবেন। যেখানে ৬ জন পরিচালক আছেন, তখন কোনো একজন ’যত দ্রুত’ যেতে চাইলেও পারবে না। কারণ সবাইকে একমত করা কোনো বিষয়েই প্রায় অসম্ভব।
ফলে গণতন্ত্রের একটা অসুবিধা আছে। কিন্তু তাই বলে আমরা কিন্তু আমাদের নেতার কাছ থেকে ওটা প্রত্যাশা করি নি বলে খুবই কষ্ট পেয়েছি। এটা একটা ব্যাপার—যা অপ্রিয় কথা। এখন এসব না বলাই ভালো। কারণ আমরা একটা দেশ পেয়েছি, দেশের নেতা সম্পর্কে খারাপ কথা বলার এটা সময় নয়। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর এমন সময় আসবে যখন সব বলা যাবে। অন্য দেশের দিকে তাকিয়ে দেখেন, একজন নেতা সম্পর্কে যে শুধু ভালো কথাই বলতে হবে, তা নয়। কিন্তু ওই অবস্থায় পৌঁছাইনি এখনও। এটা প্রচারের কথা বলছি না, আমি সত্যি বলে বললাম।
প্রশ্ন : ১৫ আগস্ট তো আপনি ঢাকাতেই ছিলেন…
উত্তর : আমি যেখানে ঘটনা ঘটেছে সেখানেই গেছি। সকালে উঠে অফিসে যাব, একটা মোটরসাইকেল ছিল আমার। নাস্তা খেতে খেতে রেডিও শুনতাম। খবর শুনছি, শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হয়েছে!
ছ'টার সময় খবর। আমি তখন তরুণ, মূর্খ বলা যায়। আমি মোটরসাইকেলে অফিসে না গিয়ে... অন্য অফিসারের পরামর্শে—যে আমার চেয়েও তরুণ, সে বলে আমরা রেডিও স্টেশনে যাই। কি হচ্ছে দেখি। আমরা ক্যান্টনমেন্টে না ঢুকে গেলাম রেডিওতে। গিয়ে দেখি সেখানে মেজর ডালিম বসে আছে। আমরা তাকে একটু একটু চিনতাম, আমার সঙ্গে যে তরুণ অফিসার গিয়েছিল সে আরেকটু ভালো করে চিনত। ডালিম-শাহরিয়ার দুজনকেই সে চিনত। এরা রিটায়ার্ড অফিসার, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা। আমরা যে মেসে থাকতাম তার পাশেই দোকান করেছিল শাহরিয়ার। তারা তখন দেশের নেতাকে মেরে ফেলেছে!
আমরা গিয়ে দেখি, যেহেতু অফিসে যাচ্ছিলাম তাই ইউনিফর্ম পরেই ছিলাম, ওখানে সৈনিকরাই তো পাহারা দিচ্ছে; ওরা মনে করল আমরাও হয়ত তাদেরই একজন—যারা রাতে এই কাজ করেছে! আমরা গিয়ে ডালিমের সামনে বসলাম, উনি ফোন করলেন কয়েকজনকে। যে রাজনৈতিক নেতা এটার পেছনে ছিলেন মানে খন্দকার মোশতাক, যিনি টুপি-পাঞ্জাবি পরে গাড়ি থেকে নামলেন ভাষণ দেবেন বলে। এটা আমার চোখের সামনে হলো। আমার সঙ্গী অফিসার যখন বলল কি হয়েছে, তখন তারা বললেন শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হয়েছে। তার লাশ রাখা আছে ওখানে, দেখে আসতে পারবেন। সব মূর্খের দল!
আমরা মোটরসাইকেল নিয়ে শেখ মুজিবের বাড়িতে হাজির হলাম। ওখানে এক অফিসার ছিল, নামটা ঠিক মনে পড়ছে না, উনি বললেন যে আমরা যেতে পারব। আমরা দুজন গেলাম এবং সেখানে দেখলাম—সামনে যে ছোট রুম আছে তার ভেতরে এক টেবিলে এক পুলিশ অফিসার মরে পড়ে আছেন। তার পাশেই শেখ মুজিবের বড় ছেলের (শেখ কামাল) লাশ পড়ে আছে। ওনারা ভেতর থেকে প্রতিরোধ করতে চেয়ে গুলি করেছিলেন। আশেপাশে বন্দুক পড়ে ছিল। যেখানে তারা পড়ে আছেন, তার পাশে একটা ছোট্ট টয়লেট, বঙ্গবন্ধুর ভাই নাসির সাহেবের লাশ পড়ে আছে। সিঁড়ির ওপরে দেখতে পেলাম বঙ্গবন্ধুর লাশ!
লাশ দেখলে আমার ভালো লাগে না। ওপরে আবার মহিলাদের লাশ। এটা ভয়ঙ্কর! আমি বললাম যে এখানে থাকতে চাই না। আমরা দুজন এরপর সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি। বঙ্গবন্ধুর লাশ আমি চোখের সামনে পড়ে থাকতে দেখেছি। ফিরে চলে আসার আগে একটা গাড়ি দেখতে পাই। সেটাতে করে ডি.এফ.আই (বর্তমান ডি.জি.এফ.আই) পরিচালক কর্নেল জামিল ওখানে গিয়েছিলেন। ওখানেই তাকে গুলি করে মারা হয়। এই হলো আমার হত্যাযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা। খুবই করুণ অধ্যায় আমাদের জীবনের। কিন্তু এটাও দেখতে হয়েছে।
প্রশ্ন : এবার তাহলে আপনার কর্মজীবনে ফেরা যাক। পাখি নিয়ে তো আপনার আগ্রহটা শৈশবেই শুরু হলো, কর্মজীবনেই পাখি নিয়ে পড়াশোনা, পাখি নিয়ে কাজ করাটা কি তখন থেকেই শুরু করলেন?
উত্তর : কিছু কিছু। কাজ ঠিক বলা যায় না। এটা হলো পছন্দের ব্যাপার। যেমন ধরুন আপনি সিনেমা পছন্দ করেন, তাই এ সংক্রান্ত পত্রিকা পড়েন—ওইরকম আর কি। অনেকে যেমন সিনেমার স্ক্রিপ্ট লেখে, কিন্তু কোনোদিন বানাবে না। আমার ব্যাপারটা সেভাবেই দেখবেন। এগুলো তো অনুশীলন বা চর্চার বিষয়। পড়ে যদি সত্যিই সেই লোক ছবি বানাতে যায়, তাহলে কিন্তু কাজে লাগবে। তো আমার জীবনে আসলে সেরকমই হয়েছে। পরে আমি আসলেই সিনেমা বানানোর সুযোগ পেলাম। ফলে দীর্ঘ জীবন যে আমি এমনি স্ক্রিপ্ট লিখেছি, মানে পাখি নিয়ে বই পড়েছি, পাখি নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের জীবন নিয়ে পড়াশোনা করেছি—ওগুলো একটু হলেও কাজে লেগেছে।
প্রশ্ন : তার মানে আপনার জীবনে অনেকগুলো ধাপ আছে। ব্যবসা থেকে চাকরি, এরপর আবার নতুন দেশে নতুন করে চাকরি শুরু করা। পরে আবার পেশার পরিবর্তন। পাখি নিয়ে কাজ শুরু করলেন। আসলে কোনটা সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছেন?
উত্তর : আসলে এগুলোকে বড় বড় ধাপ হিসেবে দেখবেন না। ব্যবসাকে অনেকে টাকার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলে। ব্যবসার মাধ্যমে আপনি টাকা হারাতে পারেন, আবার আয়ও করতে পারেন। তারচেয়ে বড় কথা হলো, আপনি মানুষের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। ব্যবসা মানেই তাই। অন্য মানুষকে জড়িয়ে ফেলা। অন্য মানুষের দায়িত্ব নেওয়া। বিয়ে করলে কিংবা বাচ্চা হলে তখন অন্য মানুষের দায়িত্ব নিতে হয়। যে বিয়ে করেছে এবং যার সন্তান আছে সে জানে সে কত বড় দায়িত্বে আছে। ব্যবসার সাথেও কিন্তু একই ব্যাপার। অনেকগুলো মানুষের দায়িত্ব নিয়ে ফেললেন। ব্যবসা লোকসান করলেও বলা যাবে না যে আমি বেতন দেব না। আবার ছেড়ে গেলে কিন্তু ব্যাপারটা আলাদা। যে, বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তার খোঁজখবর নেওয়া হয় না। খুব কম লোকের পক্ষেই এটা সম্ভব।
ফলে যত বড় ব্যবসা তত মানুষের দায়িত্ব নেওয়া। সেই মানুষগুলো হয়ত আপনাকে দেখতেও পায় না, কিন্তু আপনি দেখতে পান। সবসময় এটা আপনার মাথার ভেতরে থাকে। তাদের কথা ভাবতে হয়। সে যাই-ই ঘটুক না কেন। অনেকে ব্যবসার এই দিকটা দেখতে পায় না। সবচেয়ে খারাপ ব্যবসার মধ্যেও এটা আছে। আমরা এটা দেখতে পাই না। ব্যবসাকে একটা হিউমেন অ্যাক্টিভিটি হিসেবে সেভাবে কিন্তু আমরা দেখি না। তাকে লোকসান গুনতে হয়, ট্যাক্স দিতে হয়, কিন্তু তাই বলে সে সবসময় টাকার কথাই ভাবে তা কিন্তু নয়। আমার এক বন্ধু যিনি ইঞ্জিনিয়ার, গার্মেন্টসের ব্যবসা শুরু করেছিলেন। চারশ লোক ছিল তার কারখানায়। তিনি এখন কানাডায় থাকেন। এখন উনি প্রায়ই বলেন যে, ইশ, আমি কি অন্যায় কাজ করেছি। আমার চারশ মানুষের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতাই ছিল না। কিন্তু কেন ওটার ভেতরে গিয়েছিলাম। উনি কোটি কোটি টাকা লোকসান দিয়েছেন, ব্যবসা গুটিয়েও ফেলেছেন, সে আজ থেকে ২০ বছর আগের কথা। আজও কিন্তু উনি ৪০০ লোকের কথা ভুলছেন না, কোটি কোটি টাকার কথা কিন্তু ভুলে গেছেন।
তাহলে ভাবুন সেইসব মানুষ যারা হাজার, দশ হাজার মানুষকে চাকরি দেয়, তাদের ওপর কত চাপ! ওই চাপ যারা নিতে পারে তারাই কিন্তু ব্যবসায়ী।
ধরুন আমি যখন কলেজের ছাত্র তখন আমার দোকানে তিনজন কর্মী ছিল। সাইনবোর্ডে লেখা প্রোপ্রাইটার ইনাম আল হক, ওই সাইনবোর্ডের জন্যই আমি দোকান করেছিলাম। কিন্তু ওই তিনজনের জীবন আমার ওপরে নির্ভর করে ছিল দেড় বছর। আমি কিন্তু ব্যবসা প্রশাসন নিয়েই বিশ্ববিদালয়ে পড়েছি। এজন্য আমাকে সেনাকল্যাণে প্রেষণে পাঠিয়েছিল এয়ারফোর্স থেকে; ওখানে আমি পরিচালক ছিলাম পাঁচ বছর। ওটা তো একটা সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, আমি পরিচালক হিসেবে চালিয়েছি। ওখানেও কিন্তু হাজার মানুষ আমাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ওই পাঁচ বছরে একটা প্রশিক্ষণও হয়েছে।
তারপরে আমি আরেকটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলাম। সেখানে ৪০০ মানুষ ছিল। এসব কিন্তু একই ব্যাপার। কেবল একটু বড় কিংবা ছোট পরিসরে। আমার বয়স যখন ২০, তিনজনের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। যখন আমার বয়স ৫০, আমি তখন ৪০০ মানুষের দায়িত্ব নিয়েছি। ব্যাপারটা আসলে একই।
এ প্রসঙ্গে আমি একটা গল্প বলি। আমার বন্ধু নেদারল্যান্ডসের, আমার এখানে থাকত। ঠিক ওই সময় আমি বিমান থেকে অবসর নিয়েই ব্র্যাকের প্রোগ্রাম হেড হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা স্যার ফজলে হাসান আবেদ নিজে আমাকে ডেকে বললেন, আপনি আমাদের সঙ্গে কাজ করেন। উনি আমাকে কোনো কারণে পছন্দ করতেন হয়ত। কিন্তু আমি অবসর নেব বলেই একটা কোম্পানি খুলেছিলাম। জি.কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। কয়েকজন বন্ধু মিলেই শুরু করেছিলাম। যখন ফজলে হাসান আবেদ আমাকে বললেন, ওখানে যোগ দিয়ে ফেললাম। আমার ওই ব্যবসার জন্য জমি কেনা হয়েছিল, ব্যাংক লোন হয়ে গেল, বিল্ডিং বানিয়ে আমরা তখন রেডি।
কিন্তু আমরা তো ৭-৮ জন পরিচালক। সবাই টাকা দিলেও সবার হাজির থাকার তো দরকার নেই। আমি ব্র্যাকে চাকরি করছি, কিন্তু বাকি সবাই মিলে ঠিক করল আমাকেই চালাতে হবে। অর্থাৎ ম্যানেজিং ডিরেক্টর হতে হবে। তারা সবাই ব্যবসায়ী। আমিই কেবল চাকরি করি। যেহেতু আমি ব্র্যাকের কাজটা এত উপভোগ করছি, ওখানকার লোকজন আমাকে খুব পছন্দ করতে শুরু করল। আমার ছেড়ে যেতে মন চাইছে না। কিন্তু আমার বন্ধুরা বলছে এ কি কথা, আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্যই না ব্যবসা খুলেছ, এখন আসবে না কেমন হয়? আমি উভয়সঙ্কটে পড়ে গেলাম।
আমার সেই নেদারল্যান্ডের বন্ধুকে তখন সব খুলে বললাম। ওর নাম পিটার। তিনি বললেন আমি তো কোনো সংকট দেখছি না। উনি প্রশ্ন করলেন, তুমি যদি ব্র্যাক ছেড়ে যাও, ঠিক তোমার মতো একজন মানুষ ওরা এই বেতনে পাবে কি পাবে না? আমি বললাম আমার চেয়ে অনেক ভালো পাবে। তিনি বললেন, তার মানে তুমি ওখানে না গেলে ওরা সত্যিই কিছু হারাল না। আর তুমি যা বললে তাতে ওই কোম্পানিটাই জমবে না তুমি যদি যোগ না দাও। তুমি বলেছ সেখানে ৪০০ লোকের চাকরি হবে; তার মানে ৪০০ লোকের জীবিকা হবে এমন একটা প্রতিষ্ঠান করার সুযোগ তোমার হাতে। আর ব্র্যাকে তোমাকে সহজেই রিপ্লেস করতে পারবে। তাহলে উভয়সঙ্কট আবার কোথায়?
দেখেন আমি ওর কারণে কত উপকৃত হলাম। যেহেতু সে সমস্যার বাইরে ছিল তাই সে দেখতে পেল, আর আমি যেহেতু ভেতরে ছিলাম তাই দেখতে পাই নি। পরদিনই আমি ব্র্যাকে ইস্তফা (দুই মাসের নোটিশ) দিয়ে চলে গেলাম।
সত্যিই আমাদের ব্যবসায় ৪০০-৪৫০ লোকের চাকরি হলো। আমি সেখান থেকে চলে এসেছি, কিন্তু প্রতিষ্ঠান এখনও চলছে। আমি ব্যবসাটা এভাবেই দেখি। আমি আরও অনেককে এভাবে ভাবতে দেখেছি। যে এটা নিতে পারবে না সে ব্যবসায়ী হতে পারবে না। এটা বড় গুরুদায়িত্ব। বেশিরভাগ লোকই শুধু তার নিজের সংসারের দায়িত্ব নিয়েই হিমশিম খেয়ে যায়। অথচ ওই লোকের কথা ভাবুন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমার লোক আসতে পারছে না। ওদের পরিবার আছে। কত বড় বোঝা তার ঘাড়ে। যে এই বোঝা নিতে পারে সেই ব্যবসায়ী।
আমি কিন্তু সবকিছুর পাশাপাশি পড়ানোর কাজও করে যাচ্ছি। যখন ব্যবসা করেছি, যখন সেনাকল্যাণের পরিচালক ছিলাম তখনও আমি আর্ম ফোর্সেস স্টাফ কলেজে শিক্ষকতা করেছি। কোনোদিনই মাস্টারি ছাড়ি নি। আমি প্রায় ৫০ বছর মাস্টারি করছি। দুই নৌকায় আমার পা ছিল সবসময়। আমি কোনটাতেই ভালো না। ফলে একটা বিরাট সুবিধা যে অনেক কিছু করার সুযোগ ছিল। যিনি ১০০ মিটার দৌড়ান, তাহলে বড়জোর ২০০ মিটার দৌড়াতে পারবেন। কিন্তু ম্যারাথনে পারবেন না। আমি কোনো কিছুতেই স্পেশালিস্ট নই, ফলে অনেক কিছু করতে পেরেছি।
প্রশ্ন : আপনার শেষের কথা থেকেই আসি। আপনি কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন যে ১০০ মিটার আর ম্যারাথন দুইটা আলাদা জিনিস। যে ১০০ মিটার দৌড়ায় সে বড় জোর ২০০ মিটার দৌড়াবে। সেই প্রসঙ্গে বলি আমি যতদূর শুনেছিলাম আপনি একবার ম্যারাথনেও দৌড়েছিলেন।
উত্তর : হ্যাঁ, জীবনে একটা ম্যারাথন দৌড়েছি। উত্তর মেরুতে। তবে এখন আমি অনেক ম্যারাথন দৌড়াব। ম্যারাথন দৌড়ানো যে সোজা কাজ তা আমি জানতাম না। এটা যে কেউ দৌড়াতে পারে। কারণ আপনাকে তো কেউ পেছন থেকে তাড়া করছে না। আপনি আপনার মতো করে দৌড়াচ্ছেন। যা হোক, আমি ম্যারাথন দৌড়েছি উত্তর মেরুতে, ২০০৭ সালে। কারণ আমি এর আগে ১৯৯৭ সালে অ্যান্টার্কটিকাতে গিয়েছিলাম। সেখানে কেন গিয়েছিলাম? কারণ সেখানে পাখি দেখা যায়। আলবাট্রস, পেঙ্গুইন দেখার ওইটাই আসলে 'মক্কা'। ওখানে যাওয়ার পেছনে ভাগ্য কিছুটা সহায় ছিল।
আমি মায়ানমারে পাখি নিয়ে একটা কাজ করতে গিয়ে একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, যিনি অ্যান্টার্কটিকার ওই এক্সপিডিশনের দলনেতা। যদিও সেখানে টাকা-পয়সা খরচ করেই যেতে হয়, কিন্তু সেখানকার প্রকৃতি নিয়ে ব্যাখ্যা করা কিংবা বক্তৃতা করার জন্য একজন দলনেতা থাকেন। উনার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তিনিই ব্যবস্থা করলেন। তাই আমি গিয়েছিলাম। যেহেতু এটা পৃথিবীর একদম সর্ব-দক্ষিণে, মনে হলো উত্তরে কি যাওয়া যায়? সেটা খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত দশ বছর পরে পাওয়া গেল এবং একটাই উপায়। হয় স্কি করে যেতে হবে, অথবা ম্যারাথন। এভাবেই প্রতি বছর আয়োজন করা হয়। অন্তত কয়েক বছর ধরে এটা হচ্ছে।
২০০৭ সালে আমি সেটাতে যোগ দিলাম। গিয়ে ম্যারাথন দৌড়ালাম। ওটা আমার জীবনের প্রথম ম্যারাথন, কঠিন জায়গায়। কিন্তু আসলে ম্যারাথনটা ওখানে সোজা। কারণ শরীর সহজে গরম হতে পারে না। যতক্ষণ দৌড়ানো হচ্ছে ততক্ষণ ঠাণ্ডা নিয়ে চিন্তা নেই। তবে কিছু অসুবিধাও আছে। যাই হোক, ম্যারাথন দৌড়ানো আমার কাছে সহজ মনে হয়েছে। আমাদের দেশে তো ম্যারাথন প্রায় হয়ই না। আগে তো ছিলই না। সেজন্য জানতে পারিনি। ম্যারাথনে প্রথম ২০ কিলোমিটার দৌড়ে ফেললে বাকিটা কিন্তু সোজা। বহু মানুষ কিন্তু আলট্রা-ম্যারাথনে (একসঙ্গে কয়েকটি ম্যারাথনে) দৌড়ায়। কেউ কেউ ২০০-২৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ায়।
আগের কথায় আসি। আমার বয়স তখন ৬০ পেরিয়ে গেছে। ফলে একটু চিন্তা ছিল। কিন্তু ওখানে গিয়ে দেখি আমার মতো আরও অনেক মানুষ সেখানে আছে। আমার চেয়ে ৭-৮ বছর বেশি বয়সের মানুষও আছে। আমার বয়সী নারীরাও আছে। এবং এরা সবাই আমার আগে শেষ করেছে। সেখানে বিভিন্ন দেশের ৫ জন নারী ছিলেন, তারা সবাই আমার আগে শেষ করেছেন। আমি ম্যারাথন দৌড়বিদ হিসেবে ভালো নই, চেষ্টাও করি নি, আর করলেও পারতাম না। কারণ ওখানে যারা গেছে তারা প্রায় সবাই অ্যাথলেট বা ম্যারাথন দৌড়ে বেড়ান। আমি গিয়েছিলাম অন্য তাগিদে।
এখনও সুযোগ পেলে আমি দৌড়াব, যেটা সহজ এবং আমি করতে পারব এমন হতে হবে। সজল খালেদ এটা শুরু করেছিল। আমি এটাই তাদের বলেছিলাম যে শুরু করেন না, আর ম্যারাথন দৌড় যদি আপনি চালু করেন, সারা দেশের মানুষ টাকা খরচ করে আসবে। আপনাকে কিছুই দিতে হবে না। শুধু দৌড়ানোর সুযোগটা দিতে হয়। দুনিয়াতে এমন লাখ লাখ মানুষ আছে যাদের এমন শখ আছে। যেমন মাছ মারার শখ আছে কারো, যেখানে সুযোগ আছে চলে যায়। বহু টাকা খরচ করে। গিয়ে হয়ত কিছুই পায় না, কিন্তু পায় আনন্দ। ম্যারাথনও তাই। কিন্তু আমরা দেশেই শুরুই করিনি।
আমি বলেছিলাম, আমাদের তো ম্যারাথন আয়োজনের মতো অনেক সুন্দর সুন্দর জায়গা আছে। যেমন ম্যানগ্রোভ ম্যারাথন অর্থাৎ সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া। এই দৌড়ে অবশ্য বাঘে খেয়ে ফেলতে পারে। আসলে (ভয়) নেই। কারণ অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকলে বাঘ কাছে আসে না। আমরা কিন্তু ওইভাবে করে দেখাতে পারি। এতে সুন্দরবন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে। আবার একটা ইভেন্ট তথা ম্যারাথনও হয়ে গেল।
যেহেতু আমরা আগে এসব করি নি, তাই এগুলোকে নতুন নতুন মনে হয়। আমি বলি, কিন্তু হচ্ছে না। আমি নিজে না করা পর্যন্ত হবে না বলেই মনে হচ্ছে (হাসি)। কিন্তু হওয়া উচিত। আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা চাইলে করতে পারে। অনেক সুন্দর লোকেশনে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন করা সম্ভব। যেখানে বহু মানুষ আসবে ভিন্ন ভিন্ন দেশ থেকে। সবচেয়ে বড় কথা এটা তো আমাদের নিজের দেশেই প্রয়োজন। আমাদের দেশে কেন এটা হচ্ছে না! গত ৫০ বছরের মধ্যে নিউইয়র্ক ম্যারাথনে ২৫-২৬ হাজার মানুষ যোগ দেয় কিভাবে? শুধু যোগ দেয় না, এরা শেষ করে।
আমরা করি নি, সম্ভবত এক হলো এটা গরমের দেশ। তাই আমরা বেশি দৌড়ঝাঁপ করি না। কিন্তু আমাদের দেশে তো আর সারাবছর গরম থাকে না, কিন্তু অভ্যাস সারাবছর রয়ে যাচ্ছে। যখন গরম কমে যায়, বর্ষায় থেমে যায়, আমরা নানান অভিব্যক্তি যেখানে আছে... অভিব্যক্তি কিন্তু অনেক রমকের, তার মধ্যে শারীরিকটাই প্রধান। এটা দিয়েই শুরু হয় জীবন। ফলে ওইটা তো আমরা হারিয়ে ফেলি নি। আমাদের ওইটার চর্চা রেখে দেওয়া উচিত। এবং এটা সারা পৃথিবীতে আছে, আমাদের কাছে কেন অভাব থাকবে? নাই বলেই লোকে অভাবটা বোঝে না। কিন্তু আপনি একটু বাইরে গেলেই... আমি কিন্তু বুঝি নি। ষাট বছরে না হয়ে আরও আগে হলে আমি আরও কিছু দেশে শুরু করতে পারতাম।
প্রশ্ন : মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আরেকটু আগে?
দুইটা জিনিস যোগ করি। প্রথমত আমার এখনও মনে আছে যে আমি নিজে এই ’জগার্স হাই’ টার্মটা আপনার কাছেই শুনেছিলাম। মানে লম্বা সময় ধরে দৌড়াতে গেলে প্রথম ব্যারিয়ার যদি একজন কাটিয়ে ফেলে, তাহলে তার এমন কিছু শারীরিক পরিবর্তন হয় যে সে আর ওটা টের পায় না। সে তখন চলতে থাকে নিরন্তর। অন্তত একটা পর্যায় পর্যন্ত। আর দ্বিতীয়ত হচ্ছে সেই ইনিশিয়েটিভগুলো, হ্যাঁ সজল খালেদ শুরু করেছিলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে এখন কিছু মানুষকে চিনি যারা সত্যি সত্যি আলট্রা ম্যারাথন আয়োজন করছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর বা ২০২০ এর জানুয়ারিতে ওরা কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভে ১০০ কিলোমিটার এবং ১০০ মাইল, মানে একটা ইভেন্ট করেছিল যেটা তিনটা ক্যাটাগরি ছিল ৫০ কিলোমিটার, ১০০ কিলোমিটার এবং ১০০ মাইলের আলট্রা ম্যারাথনের আয়োজন। এবং অনেকেই সেই ম্যারাথন সফলভাবে শেষ করেছিল। ওটা ছিল ইনানি-টেকনাফ-ইনানি এরকম একটা লুপ ওরা ঠিক করে দিয়েছিল।
সিলেটেও কিছুদিন আগে এরকম একটা ইভেন্ট আয়োজন করা হয়েছিল। অর্থাৎ কিছু কিছু হচ্ছে। করোনার কারণে হয়ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার হয়ত শুরু হবে। এবার আপনার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আপনি তো এক দৌড়ে গেলেন উত্তর মেরুতে বা উত্তর মেরুতে গিয়ে এক দৌড় দিলেন। উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরুতে পাখি দেখা কেমন হয়েছিল?
উত্তর : মেরুতে কোনো পাখি দেখা সম্ভব না। মেরুতে একটা পোকাও দেখতে পাবেন না। সেখানে কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না। আপনাকে দেখতে হলে মেরু থেকে কমপক্ষে ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে থাকতে হবে। মেরুতে যখন চলে গেলেন তখন শুধু আপনি নিজেকে দেখতে পাবেন। আর কিছু না।
প্রশ্ন : আলবাট্রসের দেখা কোথায় পেয়েছিলেন?
উত্তর : সেগুলো মেরু থেকে বহু দূরে। আমি অ্যান্টার্কটিকার একদম প্রান্তে। এশিয়ার কেন্দ্র যদি মনে করেন চীনের কোনো জায়গায় বা রাশিয়ার কোনো জায়গায় হয়, আর আপনি বাংলাদেশে আছেন, ঠিক ওইরকম। ধরেন আমি অ্যান্টার্কটিকার বাংলাদেশে ছিলাম। কিন্তু মেরু ধরেন চীনে কিংবা রাশিয়া কিংবা মঙ্গোলিয়াতে, এত দূরে। উত্তর মেরুতে আবার তা নয়। আমি একেবারে মেরুতেই ছিলাম। সেখানে প্রাণী দেখা সম্ভব না। প্রাণী দেখতে আমি যাইও নি। অ্যান্টার্কটিকায় প্রাণী দেখতেই গিয়েছিলাম। সবই অ্যান্টার্কটিকার প্রান্ত দিয়ে অর্থাৎ সমুদ্র কিনারে। ভেতরে যাই নি। ভেতরে গেলে শুধু একটি পাখি দেখা যেত, সেটা হলো এম্পেরর পেঙ্গুইন। সে ১০০ কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে ডিম পাড়ে। সে ভয়ঙ্কর একটা প্রাণী। কেউ ওখানে যায় না। ফলে আমি এম্পেরর পেঙ্গুইন দেখতে পাই নি।
প্রশ্ন : আগের প্রসঙ্গটা ছিল ম্যানগ্রোভ ম্যারাথন, সুন্দরবনের কিছু জায়গায়। একসময় এমন শুনেছিলাম যে আপনার এমন প্র্যাকটিস ছিল যে সুন্দরবন ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার কোনো এক অংশে, লম্বা সময় একা কাটাতেন। সকালে হয়ত বোটে করে আপনাকে নামিয়ে দিয়ে আসল, আবার সন্ধ্যায় বা একটা পর্যায়ে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসল। এরকম একাকী জঙ্গলে ঘোরার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
উত্তর : আমি সুন্দরবনে বহু বছর ধরে যাই, বহুবার গিয়েছি। শতবারের বেশি হবে হয়ত। সবসময়ই আমি সারাদিন একাই হেঁটেছি। যেভাবেই যাই না কেন। এমনকি একটানা ৪-৫ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন, এর বেশি থাকি নি। কিন্তু সুন্দরবন বলতেই যে লোকে মনে করে সেখানে কোনো লোক থাকতেই পারে না, যেতে পারবে না, তা তো নয়। সুন্দরবন তো আসলে পানির জন্য দুর্গম। পানি, কাদা, শ্বাসমূল। তাছাড়া অসুবিধা নেই। একটা অসুবিধা হচ্ছে বাঘ। বাঘ না থাকলে লাখ লাখ লোক প্রতিদিনই যেত। বনটাই থাকত না। বাঘ আছে বলেই বনটা টিকে আছে। কিন্তু বাঘ নিয়ে মানুষের ভয়ের পেছনে একটা ঐতিহাসিক কারণ আছে। সত্যিকার কারণটা তা নয়। এখন অত বাঘ তো আর নেই। অত ভয়ঙ্করও না।
এককালে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বেরোলেই বাঘ আক্রমণ করত। সারা বাংলাদেশেই এরকম ছিল। সারা বাংলাদেশ যখন মানুষ দখল করে ফেলেছে, তখন বাঘ গিয়ে সুন্দরবনে ঢুকেছে। মানুষ বন কেটে ফেলেছে, খেত-খামার করেছে, বাড়ি-ঘর করেছে। সুন্দরবনে যে অল্প কয়েকটা বাঘ আছে, সেই বাঘগুলো কিন্তু সাংঘাতিক ভীতু। কারণ তার টিকে থাকার জন্য খুবই কঠিন একটা জায়গায় আটকে গেছে। সে একটা জেলখানায় আছে কিন্তু। তার নড়াচড়ার জায়গা নেই। কিন্তু বন্য প্রাণী হওয়ায় সে নিজেকে খাপ খাইয়েও নিয়েছে। তাই বলে এটা কিন্তু ওর জায়গা নয়। বাঘ এরকম জায়গায় থাকে না। সারা পৃথিবী দেখেন, সে পানি, কাদা, শ্বাসমূলের মধ্যে থাকে না।
আমাদের বাঘ কিন্তু খুব ছোট। আমরা মনে করি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার মানে বিশাল কিছু। তা নয় কিন্তু। এই বাঘ আকৃতিতেও ছোট। কোনোমতে টিকে আছে। সুতরাং বনে গিয়ে আপনার বাঘের প্রতি মায়া হওয়া উচিত, ভয় অতখানি নয়। বাঘ মানুষ ধরে খায়, এটা ঠিক। কারণ ওর অন্য খাবার তো অত সুলভ নয়। তাছাড়া সারা পৃথিবীতে বাঘ আছে, দেখেন কোথাও মানুষ ধরে খায় না। মানুষ তো বাঘের স্বাভাবিক খাবার নয়। দেখেও তার কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয় না।
কিন্তু কুমিরের আবার মানুষ স্বাভাবিক খাবার। শত শত বছর ধরে এরা মানুষ খেয়ে আসছে। ফলে মানুষ দেখলে সে ধরার জন্য এগিয়ে আসে। বাঘ কিন্তু তেমন নয়। সুন্দরবনের বাঘ কিছুটা কুমিরের মতো। সেটা সে পরিস্থিতির কারণে হয়েছে। ধরুন গত ৫০০ বছরে। তবে সব না, কিছু বাঘ। সুন্দরবনে শ'খানেক বাঘ আছে, তার মধ্যে ১০টি বাঘ এরকম। যেহেতু মানুষ এসব কথা এভাবে আলোচনা করে না, তাই তাদের কাছে বাঘ মাত্রই ভয়। আরেকটা কথা, বাঘ অত্যন্ত সাবধানী এবংবুদ্ধিমান প্রাণী। বুদ্ধিমান প্রাণীর কাছ থেকে আপনার ভয় কম, মূর্খের কাছ থেকে ভয় বেশি।
ধরুন গণ্ডার, বাঘের তুলনায় অনেক মূর্খ। গণ্ডারকে বেশি ভয় পেতেই হবে। সে আপনাকে দেখলেই আক্রমণ করে বসবে। আমি কাজিরাঙ্গার কথা জানি, আমি সেখানে সফরে গিয়েছিলাম, শুনলাম সেখানে একজন ভিডিও করছিল এবং গণ্ডার সোজা ছুটে এসে তাকে মেরে ফেলেছে। আক্রমণ করে চলে গেছে। বাঘ কিন্তু তা করবে না। সুন্দরবনে কোনো বাঘ, আপনি ভিডিও করছেন, আপনাকে আক্রমণ করবে এটা অসম্ভব। এজন্য না যে সে নিজেকে ভিডিওতে দেখাতে পছন্দ করে, ওই যন্ত্রপাতি দেখেই সে বুঝবে এখানে তো গোলমাল। এখানে থাকা নিরাপদ নয়।
সুন্দরবনে যদি আপনি ৩ জনে মিলে হাঁটেন, কোনোদিনও বাঘ আক্রমণ করবে না। ৩ জন মানুষ অনেক ভয়ঙ্কর বাঘের কাছে। সেজন্য আমার থিওরি ছিল, আমি যদি একটা ক্যামেরা এবং ট্রাইপড নিয়ে হাঁটি, যেটা আমি হাঁটতাম, কোনোদিন বাঘ আক্রমণ করবে না এবং করেও নি। আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন যে আমাকে বাঘে খায় নি। যদিও অনেকে ভয় পেয়েছে। আমাকে যেসব নৌকা নিয়ে গিয়েছিল, তারা সবসময় বলেছিল যে, আপনি আমাদের বিপদে ফেলবেন। আপনি আক্রান্ত হলে আমরা দায়ী হয়ে যাব। কিন্তু একেবারে নিশ্চিত যে, যেহেতু ট্রাইপড কাঁধে নিয়েছি, ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছি। বাঘ বহুবার চিন্তা করবে।
প্রশ্ন : কখনো অন্য কোনো বড় বিপদে কি পড়েছিলেন?
উত্তর : বড় বড় বিপদ বলতে পারেন, ওগুলো নিজের সৃষ্টি করা বিপদ। আমি একবার সুন্দরবন ধরে হেঁটে পোড়ামহল বলে (একটা জায়গা) ওইটা দেখে অন্য প্রান্তে বের হব এই প্ল্যান করেছি, সাথে একজন বনরক্ষী নিয়েছি। ওদের কাছে বন্দুক থাকে। সাথে আবার একজন বাওয়ালি ছিল, যারা বন থেকে লুটপাট করে, মানে গাছ কাটে, এটা সেটা নিয়ে যায়, এটা করেই ওরা জীবন কাটায়। শত বছর ধরে ওরা ওরকম করে আসছে। বাওয়ালির ছেলে বাওয়ালি। তাকে নেওয়ার কারণ, সে ছাড়া পথ হারিয়ে ফেলব। পথ বলে কিছু নেই তো! কিন্তু তারা চলে অভ্যস্ত, এই ৩ জন আমরা যাচ্ছি। আমরা কিছুদূর হাঁটার পরে বাওয়ালি তো অভিজ্ঞ, সে বলে বাঘ আসছে আমাদের পিছে। আমি বললাম দেখান আপনি, সে বলল তাহলে আমার সঙ্গে আসেন, তার পেছন পেছন হেঁটে গিয়ে দেখলাম, কাদায় বাঘের পায়ের ছাপ, ঠিকই বাঘ আমাদের ফলো করছে। কিন্তু যেই ওটা দেখল বনরক্ষী, সঙ্গে সঙ্গে একটা গুলি ছুড়ল সে। বন্দুকটা যেহেতু আমার কান থেকে ছয় ইঞ্চি দূরে, আমি বধির হয়ে রইলাম সারাদিন (হাসি)।
এটা হলো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা যা সুন্দরবনে আমার সঙ্গে ঘটেছে। সুন্দরবনে আপনি হাঁটলে আমি বহু বাওয়ালির কাছ থেকে শুনেছি বাঘ আপনার পেছন পেছন হাঁটবে, যদি আপনাকে আক্রমণ করতে চায়। সে পিছু নেবে এবং দেখবে নিরাপদ কি না আক্রমণ করা। বহুক্ষণ সে এই কাজ করবে। সে গণ্ডার নয় যে দেখল আর আক্রমণ করে বসল। সে বিপদের গন্ধ পেলে সরে পড়বে। আমরা যেহেতু তিনজন, সে আমাদের পেছনে কিছুক্ষণ হেঁটে সরে গেছে।
বাওয়ালি যেহেতু জীবনের বহু সময় বনে কাটিয়েছে, ওর বাবা-দাদারাও কাটিয়েছে, ওর এই ধারণাটা ছিল এবং সে প্রমাণও করে দিল। বাঘের একটা গন্ধ আছে যা বাওয়ালিরা বুঝতে পারে। তো এইরকম আর কি। মজার মজার অভিজ্ঞতা আছে অনেক। কোনোদিন ভয় পাই নাই, ভয়ের কিছু ঘটেও নাই।
প্রশ্ন : আপনি তো দেশের অনেক জায়গায় ঘুরেছেন, আমরা যেটাকে বলি জনমানবহীন জায়গা।
উত্তর : না, বাংলাদেশে জনমানবহীন জায়গাই নাই। আমরা যেসব জায়গায় তাবু নিয়ে থাকি, আমরা জানি ১৫ মিনিট হেঁটে গেলেই মানুষ পাব। আমি সবচেয়ে দীর্ঘদিন একটু দূরে এবং একটু দুর্গম জায়গায় গিয়েছিলাম, ২০০৩ সালে, সাঙ্গু নদী দিয়ে উজানে। সাঙ্গু নদী তো পাহাড় থেকে এসেছে, মিয়ানমারে এর উৎস। সাঙ্গু নদী আর মাতামুহুরি এই দুইটাই। আমাদের সব নদী কিন্তু উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে গেছে, কারণ দক্ষিণে সমুদ্র আর উত্তরে উঁচু জায়গা। কিন্তু সাঙ্গুটা দেখেন। সে দক্ষিণ থেকে বেরিয়ে উত্তরে গেছে। কারণ সে আর সমুদ্রে যেতে পারছে না। মাঝখানে আবার চিম্বুক পাহাড়। ফলে পুরো পাহাড় পেরিয়ে বহু উত্তরে গিয়ে তারপর সমুদ্রে নেমেছে। আর এদিক দিয়ে চলে গেছে মাতামুহুরি।
আমরা নৌকা নিয়ে রওয়ানা দিলাম, বান্দরবানের থানচির আরও আগে থেকে, নৌকা নিয়ে গিয়ে যতদূর গিয়ে মায়ানমার সীমান্ত, তারপরে আবার মাতামুহুরি দিয়ে হেঁটে ফিরে আসব। এই নদীর মাঝখানে অনেক জায়গায় হাঁটতে হয়। পাহাড়ি নদী, বেশি পানি নেই। আবার অনেক জায়গায় গভীর। সেখানে নৌকা লাগে। তো দুই নৌকার উপরে আমরা মালামাল দিয়ে রওয়ানা দিলাম। আমরা শহুরে মানুষ চার জন। আর চার জন হলো পাহাড়ি। এভাবেই পরিকল্পনা করা হলো। আমরা ৮ জন বেশ নীরব জায়গায়, যেখানে প্রাণী আছে, সেরকম জায়গায় ছিলাম।
বাংলাদেশে প্রকৃতির সাথে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ওই চার পাহাড়ির পরামর্শে, আমাদের কিছুই নিতে বলে নি। বলেছিল চাল কিনবেন ৮ জনের জন্য, এক বোতল তেল, আধ কেজি লবণ। আর কিছু প্রয়োজন নেই। আমরা এর বাইরে কিছু নেইও নি। ওরা জাল আর বড়শি নিয়েছে। পথে পথে মাছ ধরেছে। এমন কোনো বেলা নেই, তিনবেলায় মাছ খেয়েছি, শাকসবজিও। সাঙ্গু নদীতে গেলে দেখবেন পানির নিচেই ঘাস আছে। লম্বা লম্বা ঘাস, দুলতে থাকে। টান দিয়ে তুললেই হলো। খুবই চমৎকার সবজি। একটু টক টক, কিন্তু মজার। আমরা দশবেলা খেয়েছি। কোনো অসুবিধা হয়নি।
বনে বহু চালতা গাছ থাকে, ওরা চালতা রান্না করে খুব ভালো। বুনো কলার মোচায় চমৎকার খাবার হয়। কোনো থালা-বাসন নেই কিন্তু সঙ্গে। ওরা বন থেকে বাঁশ কেটে ফেলে, ওইটুকু অন্যায় আমরা ওদের করতে দিয়েছি। ওরা বাঁশের মধ্যেই মাছ, চাল পুরে একসঙ্গে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। রান্না শেষে বনভর্তি কলাগাছ থেকে কলাপাতা নিয়ে তাতে করে খাবার খেয়ে নিলাম। এভাবে আমরা ৮ দিন ছিলাম। অসাধারণ একটা ভ্রমণ। আমি এটা বেশি জায়গায় বলি না, কারণ শত শত লোক যদি এটা শুরু করে তাহলে এই জায়গাগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে। মানে তাদের মনে হতে পারে এইতো আমার অ্যাডভেঞ্চারের জায়গা হয়ে গেল। তারা ক্যামেরা নিয়ে চলে যাবে, লাইভ স্ট্রিমিং করবে। এভাবে ভুয়া আকর্ষণে কিন্তু জায়গা নষ্ট করবে। সে ওখানে প্রাণী খুঁজতেও যাবে না। সে যাবে দেখাতে যে, আমি আছি এখানে, এমন জায়গায়! এটা একটা ভয়ঙ্কর জিনিস। আমিও চাই না আপনারা এটাকে কোথাও তুলে ধরেন।
কিন্তু এটা খুবই ভালো একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে, যেখানে আমরা অনেক দূরে ছিলাম ৮টা দিন। যেখানে গাড়ির আওয়াজ শোনার কথাই ওঠে না, প্রাণীর আওয়াজ শুনতে পান। সবচেয়ে বড় কথা আপনি প্রকৃতি থেকে নিয়ে-খেয়ে থাকা। এই অভিজ্ঞতা আমার আর নেই!
প্রশ্ন : আপনি কোথাও বোধহয় বলেছিলেন, যে বান্দরবানকে আপনার অ্যামাজনের চেয়েও ইন্টারেস্টিং মনে হয়...
উত্তর : না, ব্যাপারটা আসলে তা নয়। কারণ অ্যামাজন আমি দেখি নি। আমি বলব আমার দেখা জায়গার মধ্যে বান্দরবান একটা আকর্ষণীয় জায়গা। অত বড় করে দেখার তো দরকার নেই। ধরুন, আমি বান্দরবানকে উপভোগ করার জন্য পৃথিবীর সেরা জায়গা হওয়ার দরকার নেই। তা নয়ও। পৃথিবীর প্রতিটি জায়গাই অসাধারণ। আপনি এমন কোনো জায়গা দেখান যে এটা মোটেই আকর্ষণীয় না। আপনি সাহারা মরুভূমিতে যান, ওরকম আরেকটা জায়গা কিন্তু পাবেন না। ফলে প্রতিটি জায়গার নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য আছে, সৌন্দর্য আছে, নিজস্বতা আছে। সেটাই উপভোগ করা উচিত। অন্যের চেয়ে ভালো বলে উপভোগ করার দরকার নেই।
আমার জীবন শুরুই হয়েছে বান্দরবান ট্র্যাকিং দিয়ে। ২০০০ সালে প্রথম গেলাম কেওক্রাডং। আগেও কেউ কেউ গিয়েছিল, কিন্তু আমি যাওয়ায় একটা বিশাল খবর হলো আর কি। খবরের কাগজে। কিন্তু তারপরে আরও অনেক গেছি। জায়গাগুলো ক্রমাগত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, শহর হয়ে যাচ্ছে আর কি। আমি মনে করি, যে যেখানেই যান সেখানেই জায়গাটা অবশ্যই উপভোগ করবেন, প্রতিটি জায়গাই উপভোগ্য, এমনকি শাঁখারিবাজারও! পৃথিবীর বহু মানুষ এদেশে এলে শাঁখারিবাজার দেখতে যায়। এটাও একদিক দিয়ে উপভোগ্য। আপনি শাঁখারিবাজার যদি বদলে, রাস্তাগুলোকে ভেঙে চওড়া করে, সুন্দর বাড়ি করে দেন, সেইভাবে উপভোগ্য থাকবে না। আমরা বান্দরবান কিংবা সুন্দরবন যেখানেই বলেন না কেন, যদি বদলে দেওয়া হয়, তাহলে আর উপভোগ্য থাকবে না। ওর বৈশিষ্ট্যটা নষ্ট হয়ে যাবে।
কিন্তু যারা অভিযানে যায় এবং যারা এমনিতেই ভ্রমণ করে, তাদের দিয়ে এমন ঘটনা কিন্তু ঘটে যায়। অতি সতর্ক থাকার পরও ঘটে। আর যদি আপনি সতর্কই না হন তাহলে তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। সেজন্য আমি বলি যেকোনো ভ্রমণের আগে এই কথাটা আপনাকে মনে রাখতে হবে, শুধু জানলে হবে না যে, আমি যাচ্ছি আমার দ্বারা ক্ষতি হবে। ক্ষতি বন্ধ করতে পারবেন না। কমাতে হবে। আমি যদি বান্দরবান যাই, আমি গাছের একটা পাতাও ছিঁড়ি না, তারপরও আমার দ্বারা ক্ষতি হবে, কারণ আমার কাপড়চোপড় দেখে ওখানকার লোকজন এইরকম কাপড়চোপড় পরতে চাইবে। এটা ক্ষতি নয়? ও ন্যাংটিটা পরে বলেই আমি দেখতে গেছি। আর ও মনে মনে ভাবছে এইরকম প্যান্ট কিনতে হবে।
সেজন্য আমরা যেখানেই যাই, আমরা ক্ষতি করি। সেটা একেবারে কমিয়ে আনার সজ্ঞান চেষ্টা থাকতে হবে। এরকম করে ভেবে যারা না যায়, তাদের অভিযান ভয়ঙ্কর। তাদের অভিযান হবে লাইভস্ট্রিমিং, আমি দেখিয়ে দিলাম আমি কি করছি। আমি মনে করি, ভ্রমণকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। অনেকে ভ্রমণে যান তার নিজের গণ্ডি ছেড়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে। সে কিন্তু ভ্রমণে যাচ্ছে না। সে পলাতক, পালিয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ভ্রমণই কিন্তু তাই। ঘরবন্দী বা শহরবন্দী জীবন ছেড়ে পালাতে চায়। তার মানে সে কিন্তু সুন্দরবনে যাচ্ছে না। ঢাকা থেকে পালাচ্ছে। সুন্দরবন ভ্রমণ তার কোনোভাবেই হচ্ছে না। এই ভ্রমণই কিন্তু বেশি হচ্ছে।
ভ্রমণ হলো যখন আপনি ওই জায়গাটার আকর্ষণে যাচ্ছেন। আকর্ষণ কতখানি? কেন যেতে চাইছেন? যেমন আপনি আইফেল টাওয়ারে কেন যাচ্ছেন? আপনি যদি জবাব না দিতে পারেন তাহলে বলব আপনি পলাতক। আপনি ঢাকা থেকে পালাচ্ছেন। আপনি যদি বলেন যে, দেখেন পিরামিডগুলো বানিয়েছিল আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে! সবচেয়ে বড় পিরামিডটা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু জিনিস, মানুষের বানানো। পাঁচ হাজার বছরে পিরামিডের চেয়ে উঁচু জিনিস মানুষ বানাতে পারেনি। ৫ হাজার বছরের সভ্যতা পিরামিডের চেয়ে উচ্চতায় ছাড়িয়ে যেতে পারে নি!
একজন ইঞ্জিনিয়ার বলল আমি বানিয়ে ছাড়ব। তার নাম হলো আইফেল। সে লোহালক্কড় দিয়ে, অনেকে বলে কি জঘন্য একটা জিনিস বানাল। কিন্তু তার চিন্তা ছিল মানুষ যত উঁচু বানিয়েছে, আমি তার চেয়ে বেশি উঁচু কিছু বানাব। আমি সেই জায়গা দেখতে যাচ্ছি। সেটায় চড়তে যাচ্ছি। তার মনের আগ্রহটা অন্য রকমের। সে-ই কেবল আইফেল টাওয়ারের সত্যিকারের সৌন্দর্যটা উপভোগ করতে যাচ্ছে। বাকিগুলো ভুয়া। ওখানে গিয়ে একটা সেলফি তুলে চলে আসছে। তাই না? সে পিরামিডের কথাটা জানেই না। ওইভাবে ভাবেই নি। তার ভেতরে তো ওই শিহরণ আসবে না। এই উচ্চতায় যেতে মানুষের পাঁচ হাজার লেগেছে। তাই আমি এখানে এসেছি। তার ভ্রমণ অন্যরকম হবে।
সব ভ্রমণের আগে তাই হওয়া উচিত। মানুষের ওই জায়গাটা নিয়ে এমন আগ্রহ তৈরি হবে তার জানাশোনা, পড়া, দেখা, এখন তো ইউটিউব আছে। এর মাধ্যমে তীব্র আগ্রহ তৈরি হবে, ওই জায়গার মূল্য তার ওপর বহুভাবে ভর করবে। তাহলেই তার ভ্রমণ সত্যিকারের হবে। তার আগে যা হবে, তা আসলে এমনি। ছয় মাস কোথাও যাই নি..., এরা সব পলাতক। আমি বলছি না তার যাওয়া উচিত না, তার আসলে যাওয়াই উচিত কারণ মাঝে মাঝে পলায়নও প্রয়োজন। কিন্তু দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে। যারা এভাবে জেনে শুনে ভ্রমণে যায় সেটাকেই বেশি মূল্যবান মনে করি।
বিদেশে এরকম মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি, আমাদের অনেক কম। মানে কোনোকিছু না জেনেই চলে যাওয়া। যেমন আপনি শুনেছেন এনামুল হক নামে একজন লোক আছে, এসে বললেন একটা স্বাক্ষর দেন, আর তা নিয়ে চলে গেলেন। তাহলে কি লাভ হল? উনি আমার কাছ থেকে কিছুই নেন নাই কিন্তু। হয়ত একটা সেলফি তুলে নিল। পরের দিনই ভুলে যাব, কারণ আবার আরেকটা সেলফিওয়ালা আসবে।
একটা পুরনো গল্প বলি। আমি তখন অ্যান্টার্কটিকা থেকে দেশে ফিরেছি। বহু লোক আসত। হঠাৎ মনে হলো অ্যান্টার্কটিকা বুঝি বিরাট ব্যাপার। খবরের কাগজে ছবিটবি বেরিয়েছিল। এসে অনেক অটোগ্রাফ দিতে থাকলাম। ওই আমলে অটোগ্রাফের একটা ব্যাপার ছিল। সেলফি ছিল না। একজন লোক আসলো, সে অটোগ্রাফ চাইল না। উনি বললেন আপনাকে দেখতে আসছি, আবার আসব। ঠিকই দু'দিন পর এসে হাজির। আমার মনে হলো এই লোক তো অটোগ্রাফ শিকারি না। আমার কাছ থেকে অন্য কিছু হয়ত চায়। ওই লোকটার নাম এম এ মুহিত। তাহলে আপনি যদি কারো কাছে কিছু চান, তাহলে হয়ত আপনার আগ্রহটা অন্যরকম হবে। আর কেবল একটা সেলফি চাইলে তা অত্যন্ত সাময়িক একটা আগ্রহ থাকে। তা আইফেল টাওয়ারের কথাই বলুন আর বান্দরবানের কথাই বলুন— একই।
প্রশ্ন : বান্দরবান থেকে আপনার হিমালয়ে যাওয়ার আগ্রহটা কখন জন্মাল? মানে আপনার হিমালয়যাত্রা...গিজার পিরামিড দেখে বা আইফেল টাওয়ার দেখে যে ওয়ান্ডারমেন্টটা ছিল তা কি হিমালয়ে ক্ষেত্রেও ছিল? আমি নিশ্চিত যে এ সম্পর্কে আগে থেকে জানতেন। বা দেখেছেন দূরে থেকে বা ছবিতে, বিমান থেকে। তো সশরীরে যখন গেলেন—বান্দরবান থেকে হিমালয়, এই শিফটটা কেমন? একটা তিন হাজার ফুট, আরেকটা আপনি শুরুই করেছেন প্রায় ৩ হাজার ফুটের উপর থেকে যতটুকু জানি। কেমন ছিল? হিমালয় কাছ থেকে দর্শনের মুহূর্তটা...
উত্তর : দর্শন ছাড়াও, যেহেতু এটা পুরোটাই শারীরিক। এটা ঠিক আইফেল টাওয়ার দেখে অভিভূত হলাম বা তাজমহল দেখে অভিভূত হলাম সেরকম নয়। তাজমহলে আপনার শরীরের ওপর প্রভাব পড়ে না। মনের ওপর পড়ছে কেবল। হিমালয়ে ঢুকলেই তো ভিন্ন ব্যাপার। আপনার শরীরের ওপর প্রভাব পড়বে, প্রথমবারেই। উচ্চতার পার্থক্য, আবহাওয়ার পার্থক্য এবং চারদিকের দৃশ্যাবলি। দৃশ্যটা হয়ত তাজমহলের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। না তা-ও নয়। এটা আসলে তুলনার যোগ্য নয়। তাজমহল যত সুন্দর হোক না কেন, ওটা একটা ছোট্ট স্থাপনা। আর হিমালয়ে আপনি দেখবেন এত উঁচু এক পাহাড়, যা প্রায় অবিশ্বাস্য। এবং সত্যিই পৃথিবীতে তো হিমালয়ের চেয়ে উঁচু পাহাড় নেই।
পৃথিবীর আর সব পাহাড়ের উচ্চতা হলো হিমালয়ে আমরা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করি সেখান থেকে। আর সেখানের শেষ। ইউরোপের সবচেয়ে বিখ্যাত পাহাড় মঁ ব্লার যে উচ্চতা, যেখানে সবাই গিয়ে কৃতার্থ হয়েছে, শত শত বছর ধরে মানুষ যাচ্ছে। অথচ সেখান থেকে আমাদের হিমালয়ের যাত্রা শুরু। তার উপর রয়ে গেছে সবকিছু। এমন পর্বতমালা হয় না। কোনো তুলনাই সম্ভব না। যেমন দক্ষিণ আমেরিকায় সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা আন্দিজের যে উচ্চতা হিমালয়ে এমন উচ্চতার কয়েকশ পর্বত আছে। এটা এমনই বিশাল যে কথায় বোঝা যায় না।
আপনি সেখানে গিয়ে দাঁড়ালে, লুকলা বা তার পরে গিয়ে, তখন বুঝতে পারবেন যে পৃথিবী কোথায় উঠে গেছে। দুই ভূখণ্ড চাপ দিতে দিতে কোথায় উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এটা যদি স্বচক্ষে না দেখে বা সশরীরে উপভোগ না করে মরে যেতাম এখন মনে করি সেটা একটা বড় ক্ষতি। সেজন্য আমি বলব হিমালয় সবকিছু ছাড়িয়ে গেছে। এমনকি অ্যান্টার্কটিকা এবং উত্তর মেরুতে গেছি, সব ছাড়িয়ে ওই অভিজ্ঞতা। কারণ ওটা কাউকে বলার দরকার নেই। কারণ বলে বোঝানো সম্ভব না। আপনি কাউকে নিয়ে সেখানে ছেড়ে দেন, সবারই একই অভিজ্ঞতা হবে। যারা ওখানে জন্মেছে তাদের কথা ভিন্ন, কিন্তু বাকি পৃথিবীর যে কাউকে নিলেই কিন্তু ঠিক আমার মতো করেই বলবে যে, এটা অসম্ভব একটা জিনিস। এটা পৃথিবীতে থাকার কথা না।
আসলেও নেই, এই একটা জায়গা ছাড়া। এত্ত বিশাল উচ্চতা, স্বাভাবিকভাবেই সব বরফে ঢেকে যাবেই। সারা বছর বরফে ঢেকে গেলে ভয়ংকর আবহাওয়া থাকবে সারা বছর। তার মধ্যে গিয়ে দাঁড়াবেন। এটার সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না। ফলে আমি বলব আমি মহাভাগ্যবান। আমি যদি অ্যান্টার্কটিকা না যেতাম, উত্তর মেরুতে না যেতাম তাহলেও আমি একথা বলতাম না যে আমার জীবনের বড় ক্ষতি হয়ে গেল। এটা তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ওগুলোও বিশেষ জায়গা, কিন্তু ওই যে অনুভূতিটা এটা অ্যান্টার্কটিকাতে তো হয়ই না, যারা প্রাণী ভালোবাসেন না এটা তাদের কোনো চমক দেবে না।
অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে কোটি কোটি প্রাণী আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সত্যিকারের কোটি। আপনি দশ লাখ পেঙ্গুইন একসঙ্গে দেখতে পাবেন। এমন জায়গায় প্রতিদিন যেতে পারবেন। কিন্তু প্রাণী যারা ওইভাবে ভালোবাসেন না তাদের জন্য চাঞ্চল্যকর অতটা না। হয়ত মেরুটা অমন হবে, যেখানে আমি যাই নি। উত্তর মেরুতে যেহেতু আমি গিয়েছি, বলতে পারি ভয়ঙ্কর শারীরিক একটা অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেখানে আবার মানসিক ব্যাপারটা নেই। চোখের সামনে ওইরকম অভিভূত করার মতো কিছুই নেই, শূন্য প্রান্তর।
হিমালয়ের যেকোনো উঁচু জায়গায় দাঁড়ালে দুটোই আছে। আপনার চোখের সামনে এমন একটা জগৎ দাঁড়িয়ে আছে যেটা অসাধারণ। কোথাও আর পাবেন না। অদেখা এক জগৎ। আবার পুরো শরীরে তা অনুভব করতেও পারবেন। এজন্য আমি বলব, আমার যেসব বিরল জায়গায় যাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে, তার মধ্যে এভারেস্টের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ানো, হাঁটা, ক্লান্ত হয়ে উপরে ওঠা, পরদিন আবার যাত্রা শুরু করে আবার চাঙা, আবার ভয়ঙ্কর চারিদিক, আবার ওইরকম একটা চোখ এবং মনের ওপরে প্রভাব। সব মিলিয়ে অসাধারণ।
প্রশ্ন : হিমালয়ের ব্যাপারে আগ্রহ শুরু হলো কবে থেকে, কীভাবে?
উত্তর : আগ্রহ ছিল না বলব, এটা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। যেহেতু প্রথম পাহাড় এবং এর ওপর যে বরফ পড়ে তা আমি দেখতে পেলাম (বাঙালির ভাগ্যই হয় না) যখন আমি এয়ারফোর্স ট্রেনিংয়ে গিয়ে কাশ্মীরে, ওরা বলে মারি হিলস, সেখানে ট্রেনিং করলাম। সেখানে বরফ পড়ে। এই প্রথম দেখলাম যে আকাশ থেকে তুলার মতো বরফ পড়ছে। এবং পাহাড়ে হাঁটার অভিজ্ঞতা হলো। কিন্তু সেটা আমি আর কোনোদিন কাজে লাগাই নি। কাজে লাগতে শুরু করল যখন আমি ২০০০ সালে বান্দরবানে গেলাম এবং নিয়মিত যেতে শুরু করলাম।
আমি তার আগেই পাখি দেখার জন্য বহু জায়গায় যেতাম। উপকূল কিংবা হাওরে। তো সেই পাখি দেখার আমার যে সঙ্গীরা ছিলেন তাদের সঙ্গে আমার ঘরে আড্ডা হতো। মাসিক আড্ডা। আমরা বলতাম বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব। আমরা পাহাড়েও যখন যেতে শুরু করলাম, ২০০০ সাল থেকে, পাখি দেখার জন্যই মূলত যেতাম। সব জায়গায় কিন্তু পাখি ভিন্ন ভিন্ন। আমরা ২০০০ সালে পাহাড়ে দুজন বিদেশিকে নিয়ে গিয়েছিলাম, যারা পক্ষীবিশারদ। একজন মারা গেছেন, ডেভ জনসন। আমরা নতুন কয়েকটা পাখি পেলাম। নতুন বলতে আগেই ছিল, কিন্তু তালিকাভুক্ত ছিল না।
তো ওইভাবে পাহাড়ে যেতে শুরু করলাম, নিয়মিত। আমি, মুহিত, আরও কয়েকজন। মুহিত কিন্তু পাখি দেখে বলেই আমার সঙ্গে আছে। কিন্তু তখন আবার অনেক তরুণ আস্তে আস্তে আমাদের দলে যোগ দিল। ঘর ভরে গেল এবং সবাই আমাদের সঙ্গে বান্দরবানে যায়, আমাদের সঙ্গে হাঁটে। পাহাড়িদের বাড়িতে থাকে, ওদের খাবার খায়। আবার একসঙ্গে চলে আসি ঢাকায়। আস্তে আস্তে দলটা বড় হয়ে গেল। দেখলাম যে ওরা কেউ পাখি দেখার জন্য না, আমরা যে পাহাড়ে যাই ওই হাঁটাটুকুর জন্যই যায়। তাই আমি দুটো দল ভাগ করলাম। একটাকে নাম দিলাম ট্রেকার্স ক্লাব এবং অন্যটির নাম দিলাম পাখির ক্লাব। যাতে দুই দল ভাগ হয়ে যেতে পারে। অনেকে দুই দলেই থাকত, যেমন আমি এবং মুহিত।
আবার অনেকেই পাহাড় দেখার জন্য যায়। এরকম করে ওই দলটা ভারী হয়ে গেল। আমরা বান্দরবানের পাহাড়ের সঙ্গে পরিচিত হলাম। অনেকেই অনেক জায়গায় গিয়ে থাকতে শুরু করল। সারাদিন হাঁটতে শুরু করল। বান্দরবানে অনেক কঠিন ট্র্যাকিং আছে কিন্তু। হিমালয়ের চেয়ে কঠিন হবে অনেক জায়গায়। যদি খাড়া পাহাড় হয়, তাহলে অনেক কঠিন, পড়ে গিয়ে হাড়গোড় ভাঙতে পারে। হিমালয়ের চেয়ে আরও ভয়ংকর জিনিস আছে আমাদের পর্বতে, যা হিমালয়ে নাই, সেটা হলো মৃত্যুঝুঁকি। অনেক বেশি আমাদের পাহাড়গুলোতে। ম্যালেরিয়ার জন্য। এখন একটু কমেছে, কিন্তু আমাদের ওই সময় ছিল। একটা দলের এক ছেলে মারা গেছে ম্যালেরিয়াতে। সেরেব্রাল ম্যালেরিয়া হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে মৃত্যু হবে।
আমি একটা ছেলেকে চিনি সে বহুদিন হাসপাতালে ছিল। ভুল চিকিৎসার কারণে তার শ্বাসনালী নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে সে আমাদের দলে যোগ দিয়েছে। তো এরকম ঝুঁকি কিন্তু বান্দরবানে আছে। যেটা হিমালয়ে নেই। তো ওই করেই আমরা এখানে ট্র্যাকিং শুরু করি। চার বছর পার হওয়ার পর তখন আমরা বলতে শুরু করলাম হিমালয় তো আমাদের ঘরের কাছে। সবচেয়ে আগে গেলেন ইমরান এবং রিফাত। আমার তখন উত্তেজনার শেষ নাই। সশরীরে গিয়ে রিফাত এভারেস্টের বেসক্যাম্পে গেছে। কালাপাথরে উঠেছে ইমরান। আমরা তখন বললাম আমরাও হিমালয় ট্র্যাকিংয়ে যাব, আমি নাম দিলাম এভারেস্ট টিম ওয়ান। আমরা বললাম আরো টিম হবে, হোক। কে নাম লিখবে জানতে চাইলে আমি বোর্ডে গিয়ে আমার নাম লিখলাম। আরও অনেকেই নাম লিখল। সেখানকার অনেকেই কিন্তু এভারেস্টজয়ী।
এমনি করে আমরা শুরু করলাম এবং প্রশিক্ষণে চলে গেল সবার আগে ইমরান। তারপর আমরা অনেককে উৎসাহ দিলাম। টাকা-পয়সা যোগাড় করলাম। তারপর দেখা গেল অত টাকা লাগে না। দার্জিলিংয়ে ট্রেনিং করার ব্যবস্থা আছে, অল্প টাকায়। আমরা তখন বহু লোককে পাঠাতে শুরু করলাম। এবং আমরা ৬০ জনের প্রথমে বেস ক্যাম্প ট্র্যাকিংয়ে গেলাম। এরপর আপনিই গড়িয়ে গড়িয়ে অনেকদূর গেছে। আমরা খুবই খুশি যে এটা আপন গতিতে গিয়ে অনেক দূর পৌঁছে গেছে। অনেক সাফল্য নিয়ে এসেছে। এখানে কোনো একজনের কৃতিত্ব নেই। এটা শুরু করার পর আপন শক্তিতে গেছে।
প্রশ্ন : এবার আমরা পাহাড় থেকে সমুদ্রে আসি। আপনি আমাদের সমুদ্রে মোহনাতে ঘুরেছেন এবং গভীর সমুদ্রেও গেছেন বোধহয়। অন্তত একবারের কথা জানি।
উত্তর : গভীর সমুদ্রে যাওয়ার একটি অভিজ্ঞতা আছে। সেটা অ্যান্টার্কটিকায়। সেখানে যেহেতু জাহাজে যেতে হয়, ওইটাই গভীর সমুদ্র। আমাদের এখানে গভীর সমুদ্র শুরু হয়েছে উপকূল থেকে ১০০ কিলোমিটার দূর থেকে। মহিসোপানের পরেই কিন্তু আমাদের একটা বড় গর্ত আছে। ’সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’ নাম দিয়েছে, তবে এটা মোটেই তা নয়। এটা একটা ট্রেঞ্চ বা গভীর গর্ত। যেমন মারিয়ানা ট্রেঞ্চ যেখানে হিমালয় ছেড়ে দিলে তা হারিয়ে যাবে--সেটাকে বলে ট্রেঞ্চ। আর এটাকে ব্রিটিশরা বলেছে ’সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড’। যা হোক আমি অতদূর পর্যন্ত গিয়েছি। আমি ওখানে ১০ দিন জাহাজে ছিলাম।
কিন্তু একটা কথা বলি, আমরা কিন্তু এমন উপকূলে কোনো অভিযান করি নি। অভিযান বলতে যেটা পরিকল্পনা করে করা হয় এবং যে-পথে আগে কেউ যায় নি। আমরা উপকূলে কেউ এটা করি নি। এভারেস্ট তার মধ্যে পড়ে না। অ্যান্টার্কটিকা তার মধ্যে পড়ে না। উত্তর মেরুও তার মধ্যে পড়ে না। এগুলো অন্য লোকেরা আগেই গেছে। আমি সাজানো ভ্রমণে যোগ দিয়েছি। এটার জন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। আমার অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। কিন্তু ওই অর্থে অভিযান বলা যায় না।
আমরা যদি বান্দরবান সফরগুলো না ধরি, আমাদের অভিযান হতে পারে এখন একমাত্র সাগরেই। পৃথিবীর মানুষ দেখেন সাগরে বহু অভিযান করে। ১২ বছরের মেয়ে সারা পৃথিবী ঘুরে এসেছে একাকী। সেগুলো হলো অভিযান। কিন্তু আমাদের সাগরে কেউ আমরা ৫০ কিলোমিটার পরে যাই নি। যেখানে মাছ ধরতে যায় জেলেরা, কিন্তু ওটা অভিযান নয়। কারণ ওদের বাবারা ওদের শিখিয়েছে ছোটবেলা থেকেই। বাবাদের আবার তাদের দাদারা শিখিয়েছে। ওটা অভিযানের মধ্যে পড়ে না। কঠিন কাজ সন্দেহ নেই, কিন্তু অভিযান নয়। তারা মরে যাচ্ছে সেখানে ঝড়ের কবলে পড়ে, ডাকাতের হাতে, তারপরও এটা অভিযান নয়। আপনি বা আমি যদি যাই সেটা অভিযান হবে।
আমরা কেউ সেই অভিযানটি করি নি, কেউ না। আমি ৫০ কিলোমিটার দূরে নৌকা নিয়ে অভিযানে গেলাম, হয়ত একজন মাঝি রাখলাম। কিন্তু বাকিরা সবাই আমরা। বাকি সব আমরাই করব। সেখানে আমরা আয়েশ করার জন্য যাব না। তবে রুটটা এমন করতে হবে যেখানে মাঝিরা যায় না। ওই অভিযানের জন্য আমাদের সামনে শুধু সাগরটাই খোলা আছে। আমরা চাইলে হাজার কিলোমিটার যেতে পারি, কেউ থামাবে না। ওটা তো আন্তর্জাতিক সীমানা, আপনি চাইলে সোজা অ্যান্টার্কটিকায় যেতে পারেন নৌকা চালিয়ে। কেউ বাধা দেবে না, আমাদের উপকূল কিন্তু পুরোটাই দক্ষিণে, ফলে আপনি সোজা যেতে যেতে শুধু অ্যান্টার্কটিকাই পাবেন। তার আগে কিছু নেই। এমনকি আন্দামান দ্বীপপুঞ্জও অনেক পশ্চিমে।
আমরা এখানে প্রথম অভিযান আরও করি নি। ফলে কোনো অভিযান করার গর্ব করতে পারি না। পঞ্চাশ কিলোমিটারও যাই নি। আমি আশা করি যে, কেউ ১০০ কিলোমিটার যাবে। একটা দারুণ অভিজ্ঞতা হবে কিন্তু। আমি বরং একটু বলব বাংলা চ্যানেল যেটাকে বলা হয়, টেকনাফ থেকে সাঁতরে যাওয়াটা একটা অভিযান কিন্তু। প্রথম যিনি এই চ্যানেল পাড়ি দেন সেই হামিদ ভাই অসাধারণ একজন মানুষ, যখন আমাকে প্রথমবার বললেন উনি, আমি বললাম এটা অনেক বেশি ঝুঁকির কাজ। বললাম, হ্যাঁ আমি তো পারব না, তরুণরা হয়ত পারবে। আপনি কত বড় ঝুঁকি নিচ্ছেন ভেবে দেখেন। কিন্তু উনি করে ফেললেন। এবং উনিই সত্যিকারের অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এটা বাংলাদেশে প্রথম অভিযান বলা যায়, উনি যত হালকাভাবেই শুরু করুক, ওটা অভিযান।
এখন অনেক কঠিন করা হয়েছে। অনেকেই যোগ দিচ্ছে। কিন্তু ওইটা অভিযান নয়। এখন সবাই সাজানো পথেই যাচ্ছে। আমাদের সাগরের এরকম অনেক অভিযান অপেক্ষায় আছে। আমরা পানির মানুষ। আমাদের পূর্বপুরুষরা নিজেরা নৌকা বানাত, নিজেরা চালাত এবং তারা নৌকার ওস্তাদ ছিল। আমরা সেগুলো হারিয়ে ফেলেছি। আমরা নৌকা বানাতেও পারি না, চালাতেও পারি না। কিন্তু একেবারে কোনো জিনিস তো হারিয়ে যায় না। হাতে নিলেই হবে। ধরেন আমরা এখান থেকে যাত্রা করলাম চট্টগ্রামে, নামলাম প্যারাডাইজ বে, অ্যান্টার্কটিকায়। অসম্ভব নয়। এর চেয়ে ভয়ঙ্কর কাজ মানুষ কিন্তু করেছে।
প্রশ্ন : আমাদের শহরবাসীদের মধ্যে খুব কম মানুষ উপকূলে ঘুরেছে। আমাদের মোহনাটা কেমন লেগেছে আপনার কাছে? এই যে নতুন একটা চর তৈরি হচ্ছে, বা শুধু বালিয়াড়িটা জেগেছে, আমার ধারণা অনেক চরকে আপনি হয়ত আস্তে আস্তে সবুজ হয়ে উঠতে দেখেছেন--
উত্তর : আস্তে আস্তে না, দ্রুত। কারণ আমরা সবুজ করছি। সবুজায়নের একটা ব্যবস্থাপনা আছে। নতুন চর উঠলেই সেখানে গাছ লাগিয়ে রেখে আসা হয় বন বিভাগ থেকে। তাতে চর তাড়াতাড়ি শক্ত হয়। নয়ত ১০০ বছরে হতো, এখন পাঁচ বছরেই হয়। এটাকে বলে উপকূলীয় সবুজ-বেল্ট। শত শত চরকে ওইভাবে সবুজায়ন করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভূমি কোনো একদিন দ্বিগুণ হবে। আমরা এখনই দেড়গুণ আছি। ব্যবহার করতে পারছি না, কারণ ওটা ব্যবহারের উপযোগী হতে ৫০ বছর বা ১০০ বছর লাগবে। সেটাকেই এগিয়ে দেওয়া হয় যদি গাছপালা লাগিয়ে আসে। গাছ লাগালে মাটি শক্ত হবে, অন্যান্য প্রাণীরা আসবে।
আমরা একমাত্র এভাবেই সমুদ্রের ভেতরে কিছু জায়গা যোগ করতে পারি। আমরা মাটিটা পাচ্ছি কোথা থেকে, হিমালয় থেকে। হিমালয় থেকে ধুয়ে আসছে এখানে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাটি প্রবাহিত হচ্ছে আমাদের এখানকার গঙ্গা, যমুনা, পদ্মা নদীর মাধ্যমে। এটাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে অ্যাকটিভ ডেল্টা, যেখানে সবচেয়ে বেশি জমি তৈরি হচ্ছে। আমার ওই জায়গাগুলো দেখার অভিজ্ঞতা আছে গত ২২-২৩ বছর। আসলে ২৭ বছর, আমি প্রথমে গেছি। ২০০০ সাল থেকে আমি প্রতি বছর যাই। এ সম্পর্কে এখন অনেকেই জানে, আগে জানত না। কিন্তু একটা দুঃখজনক দিক আছে, যেহেতু বৈশ্বিক উষ্ণায়নে সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় জিনিসটা আবার কমিয়েও দিচ্ছে। জায়গা যেটুকু বাড়ছে, তার বেশকিছু আবার পানি বেড়ে খেয়ে ফেলছে। তবে যেটা বাড়ছে তা অনেক বড়। সমুদ্রের পানির উচ্চতা হয়ত বাড়ছে ১০০ বছরে দুই ইঞ্চি বা তিন ইঞ্চি, আমরা তো প্রতিদিন দুই ইঞ্চি-তিন ইঞ্চি করে পাচ্ছি। অনেক জায়গা একদিনেই হয়ে যাচ্ছে। যেখানে ভরা জোয়ার, তার ওপর তো আর মাটি নিতে পারে না পানি। এ কারণে আমরা সমুদ্রের বহুদূর চলে গেছি।
প্রশ্ন : আপনার বইয়ে রাসেল মিটারমায়ারের সঙ্গে আপনার একটা কথোপকথন আছে। খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার যে, সে আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছে যে— (ইনাম আল হক: আমার বইয়ের সবকিছু কিন্তু সত্যি ঘটনা, কারণ আমি বানিয়ে লিখতে পারি না, বইয়ে যা কিছু লিখেছি ওই ডাকাতের হাতে পড়া, কিংবা নিজে ডাকাত হিসেবে আটক হওয়া সব সত্যি।) –যদি পর্যটকদের অ্যালাউ করো তাহলে পর্যটকরাই বন এবং এর পরিবেশ রক্ষা করবে। নয়ত বন্যদস্যু বা অন্যরা এসে সব পাখি খেয়ে ফেলবে। আপনি এক জায়গায় লিখেছেন যে তার পরামর্শে আপনিও বেশ চমকে গিয়েছিলেন। আপনি এখানে চারটি বিপন্ন পাখির নাম বলেছেন যারা বিশেষ করে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করেই বেঁচে থাকে। সুন্দরবন না থাকলে তারা নাই হয়ে যাবে। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার তো বিপন্ন হবেই।
এখন সুন্দরবনের গা ঘেঁষে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে। অনেক সংগঠন এটা নিয়ে আওয়াজ তোলার চেষ্টা করছে। তেল গ্যাস রক্ষায় জাতীয় কমিটি বা সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় কমিটি নানা ধরনের লং মার্চসহ বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটি দেখাচ্ছে। এই রকম উন্নয়ন, এই যে শহরের বাসাবাড়িগুলো এখন এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে যে সেখানে আর পাখিরা বাসা বাঁধতে পারে না। এই জল-জমি-জঙ্গল বা প্রকৃতির উপযোগী করে নগরায়ন করা আদৌ সম্ভব কি না? আপনি তো বলেছেন, মানুষ গেলেই ক্ষতি হবে। কিন্তু আমাদের এখন এই ক্ষতি যতটুকু কমানো যায়। নগরায়ন তো বন্ধ করতে পারছি না, সেটাকেই কীভাবে কমানোর মধ্যে রাখা যায়? মানুষ তো প্রকৃতিরই সন্তান। ফলে প্রকৃতি না বাঁচলে অদূর ভবিষ্যতে আমরাও থাকব না। এখন পাখি দেখে বাঁচছি, কিছুদিন পর সব পাখি খেয়ে ফেললে তো আমারও বাঁচার উপায় থাকবে না।
উত্তর : বিষয়টা এত বেশি জটিল, এত মানুষ এটা নিয়ে কথা বলেন যে আমি তুচ্ছ ওই হিসেবে। আমি এসব কথার শ্রোতা বা পাঠক কেবল। সমস্যাটা আসলে অনেক গভীর। একটা রামপাল বা ঢাকা শহর এগুলো সত্যিকার অর্থে পৃথিবীর এত বড় বড় সমস্যা যা আমরাই তৈরি করেছি, তার কাছে এগুলো তুচ্ছ। আলোচনাই করা উচিত নয় হয়ত। যেটা নিয়ে আলোচনা করতেই হবে সেটা হলো যে আমরা ক্ষতি করছি। এই ক্ষতিটা কমিয়ে আনতে হবে। রামপাল একটা তুচ্ছ ঘটনা।
আমরা যে শার্ট পরেছি এটাও একটা বিরাট ক্ষতি। অনেক অনুষ্ঠানে আমরা টি-শার্ট ছাপাই। এগুলো অপ্রয়োজনীয়। একটি টি-শার্ট কত ক্ষতি করে পৃথিবীর? তার হিসাব এখন কিন্তু আছে। এখন আমাদের যেটা করতে হবে তা হলো এখন সবাই মিলে বলতে হবে ভোগ সীমিত করতে হবে। তাহলে একটা ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হবে। তাহলে কি হবে? ইন্ডাস্ট্রিগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, আপনার ভাই চাকরি হারাবে। কারণ এখনকার অর্থনীতি হলো উৎপাদন নির্ভর। ভোগ করি বলেই তো উৎপাদন হবে। বেশি শার্ট কিনি বলেই তো শার্টের ফ্যাক্টরিগুলো আছে। দুটো শার্ট হলেই যেখানে চলে, আপনার দাদার কিন্তু একটাও ছিল না। অন্তত আমার দাদা বা বাবা একটাই কিনেছিল, তাও আবার জমা করে রাখত শ্বশুরবাড়ি গেলে পরার জন্য। তাও পথে পরতো না, বাড়ির কাছে গিয়ে পরতো। এভাবেও কিন্তু চলে। কিন্তু আমার কয়টা শার্ট আছে আমি জানি না। আপনারাও পারবেন না। এটা ভয়ঙ্কর।
এতদিন এভাবে চালিয়েছি, এখন আর চলছে না। এখন বলতেই হবে যে কম খেতে হবে, কম পরতে হবে। কম ভ্রমণও করতে হবে। অভিযানও কমিয়ে ফেলতে হবে। তার কারণ আমরা সব ধ্বংস করে ফেলছি। মৃত্যুর সীমায় পৌঁছে গেছি। এখন আর ওসব ভাবার সময় নেই যে, তাহলে তো ইন্ডাস্ট্রি চলবে না, প্রবৃদ্ধি আটকে যাবে, আমার ভাই চাকরি হারাবে। সবাই মিলে যদি মরেই যাই, তাহলে এসব প্রশ্ন তো আর থাকবে না। তাহলে আমাদের প্রথমেই বলতে হবে যে, আমরা ভোগ কমাব। এজন্য হাজারো সমস্যা আসবে। আমরা তো সমস্যা সমাধান করে করেই এতদূর এসেছি। সমস্যা হবে বলে বন্ধ করা যাবে না। করলে কিন্তু আমি হয়ত ঠিক আছি, আপনার ভবিষ্যৎ অন্ধকার, আপনার ছেলের তো নেই-ই।
এখন আর ছোটখাটো ব্যাপারে কথা—আসলে সময় নষ্ট হবে। এখন সোজা বলা যে আপনি কয়টা শার্ট কিনেছেন গত ১০ বছরে? নাকে খত দেন, যদি একটার বেশি থাকে। আমিও কিনেছি একটার বেশি, কিন্তু আমি নাকে খত দিতে প্রস্তুত আছি, কারণ অন্যায় করেছি। এই বোধ তৈরি করতে হবে। এত যে বই, আপনি যদি জিজ্ঞাসা করেন এত বই কি লাগে, কয়টা পড়েছেন আপনি? বইও যে ভালো তা বলছি না কিন্তু, সবকিছু আমরা বেশি বেশি করেছি! কারণ করা যায়, কেন করব না, সুন্দর লাগে বই। আমি পড়ি নি কিন্তু সাজিয়ে রেখেছি। শার্টেরও তাই। এগুলো কমিয়ে ফেলতে হবে।
এখন সোজাসাপ্টা বলতে হবে, ভোগ কমিয়ে দেন, খাওয়া কমিয়ে দেন, পরা কমিয়ে দেন। তাতে আরেকটা জিনিস এমনিতেই কমে যাবে। আপনি কমিয়ে দিলে ওষুধ বিক্রি কমে যাবে, কমতে বাধ্য। সব অসুখের গোড়া হলো বেশি খাওয়া। যে বেশি খায় সে যত ব্যাখাই দিক, তার মূল সমস্যা হলো সে বেশি খায়। ফলে আমরা যখনই খাওয়া কমিয়ে দেব, পরা কমিয়ে দেব অনেক বিপদ হবে। সেই বিপদের মোকাবিলা করতে হবে। ফলে রামপালে কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো ঠিক হবে না তা নয়, বিদ্যুৎ (উৎপাদন) বাড়ানোই ঠিক হবে না। একথাটা কি বলতে পারবেন?
লোকে আপনাকে পেটাবে। কিন্তু এখন বলতেই হবে। এখন সেই সময় এসেছে যে, বিদ্যুৎ, গাড়ি, তেল এগুলো বাড়িয়ে যেতে হবে তা নয়, ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে। একেবারে প্রয়োজন ছাড়া দেওয়া হবে না। বাড়িতে বিদ্যুতের সাপ্লাই কমিয়ে দিলে এত এসি চলবে কি করে? আপনি ভেবে দেখেন কি করে চলবে। আমি দিতে পারব না। কারণ এতে আমরা অনেক মানুষকে মেরে ফেলব। তারা ভবিষ্যতের মানুষ, আপনার ছেলে-মেয়ে-নাতিরা। আপনার নাতির হয়তো জন্মই হবে না আমি বিদ্যুৎ বেশি ভোগ করছি বলে। এখন এসব কথা বলার সময়ে এসেছে। জোরালো স্বরেই বলতে হবে। ছোটখাটো বিষয়গুলো ছেড়ে দেন, এখন বড়টা নিয়ে বলার সময় এসেছে।
প্রশ্ন : আপনার ক্ষেত্রে একটা প্রসঙ্গ না আনলেই না যে, বাংলাদেশের পাখি। আপনি কীভাবে দেখেছেন, উপভোগ করেছেন, আপনি আশা করেন কীভাবে থাকবে আরও সামনের সময়ে? কেমন দেখলেন বাংলাদেশের পাখি। প্রায় অর্ধেক জীবন পাখি দেখছেন, না কি আরও বেশি? কেমন লাগল? এই পাখি আর কত বছর থাকবে বলে মনে করেন?
উত্তর : এখনও নাই তো। এখন কি আর আছে? নাই, পাখি নাই।
জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় ধরে পাখি দেখছি। আমাদের দেশে এখন পাখি নাই বললেই চলে। শূন্য বললেও অত্যুক্তি হবে না। যেটুকু আছে তা শূন্যের খুব কাছাকাছি। যারা পাখি দেখে তারাই কেবল এটা বলতে পারবে। আপনি যে পাখিগুলো দেখতে পাচ্ছেন, সেগুলো হলো বর্জ্যভুক পাখি। যেগুলো বর্জ্য খেয়ে বাঁচে। যেমন চিল, শালিক, চড়ুই। মনে হচ্ছে অনেক পাখি আছে। আসলে পাখি একদম শেষ হয়ে গেছে। শুধু বাংলাদেশে না, পৃথিবীতেই একই অবস্থা। এশিয়ায় সবচেয়ে ভয়ংকর, এশিয়ার মধ্যে আবার সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ধরুন বাংলাদেশ, চীন অর্থাৎ যে জায়গায় উন্নতি হচ্ছে।
উন্নতি মানেই বন্যপ্রাণী শেষ করে ফেলা। নয়ত নতুন নতুন জায়গা পাচ্ছে কোথায়? নতুন নতুন কারখানা কোথা থেকে হচ্ছে? সেটা তো শূন্য থেকে হচ্ছে না। আপনি একজনের জায়গা দখল করছেন। আপনি জানেন না যে ওই জায়গাটা তার ছিল। কিন্তু ছিল। কোনো পাখি হয়ত সেখানে বিচরণ করত। আপনি সেখানে ১০০ গাছপালা কেটে কারখানা বানালেন। কিন্তু ওই গাছগুলো যে পাখিদের বাসা ছিল তা আপনি জানলেনই না। গাছ ছিল তা জানলেন। ফলে এভাবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের সঙ্গে একেবারে মুখোমুখি সংঘর্ষ হচ্ছে বন্যপ্রাণীদের।
বাংলাদেশ এত ছোট দেশ, এত বেশি মানুষ আমরা। এখানে সমস্যাটা আরও ভয়ঙ্কর। এটা বলে বোঝানো যায় না। এটা ক্রমাগত আরও বাড়বে। আমি ঢাকায় এসেছিলাম—সেই ঢাকার সীমান্ত ছিল রমনা পার্ক। তার এ পাশে বিরানভূমি। কিছুই ছিল না। যাওয়াই যেত না। একটা সরু পথ ছিল তেজগাঁও নামে জায়গায়। আমি নিজে দেখেছি এটা। এয়ারপোর্ট ছিল কিন্তু যাওয়ার জায়গা নাই। ওটাকে পাকা করা হলো যখন ব্রিটেনের রানি ভ্রমণ করলেন তখন। ১৯৬০-৬২ সালের দিকে। তেজগাঁওয়ের পেছন দিকে তখন ভয়ানক ঘন জঙ্গল।
আমি একটা বইয়ে কাজ করেছিলাম, এনভায়রনমেন্ট অব বাংলাদেশ নিয়ে, সেখানে ৪০০ বছরে ঢাকার কি পরিবর্তন হয়েছে সেটা নিয়ে লেখা। ওই বইয়ের বন্যপ্রাণী অংশটা আমি লিখেছি। আমাকে নির্ভর করতে হয়েছে অন্যের লেখা নিয়ে। আমি অনেক পড়েছি। আপনি কি জানেন আমাদের চিড়িয়াখানা কোথায় ছিল? সাধারণত চিড়িয়ানা থাকে শহরের সীমান্তে। সেই জায়গায় এখন সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে ছিল চিড়িয়াখানা। শহর যেহেতু বড় হচ্ছে, তাই সেটাকে সরিয়ে নেওয়া হল রমনা পার্কে। পরে আমরা মিরপুরে নিয়েছি। আর সরাতে হবে না। এখন আর কোথায় নেবেন? আমরাও সংখ্যায় বেড়ে যাচ্ছি।
সুতরাং অন্যের দিকে তাকানোর দরকার নেই। আমরা একই রকমের ক্ষতি তো এখানেও করছি। এখানেও তো বন্যপ্রাণী ছিল। বইয়ের কথায় আসি। আমি বইতে লিখেছি, ঢাকায় কয়েকটা ভয়ঙ্কর জায়গা আছে, যেখানে দিনেও যাওয়া যায় না। কারণ সেখানে অন্য প্রাণীর সঙ্গে বন্য শূকর আছে। দিনেও লোকে আক্রান্ত হতো। বন্যপ্রাণীর মধ্যে শূকরকে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায়, বাঘের চেয়েও। তখন ঢাকাতেও বাঘ ছিল। কিন্তু শূকর বেশি আক্রমণ করে, মানুষ বেশি আহত হয়। বাঘ বুদ্ধিমান প্রাণী বলে অত আক্রমণ করে না। এটা কিন্তু আজ থেকে মাত্র ১২০ বছর আগের কথা। যে বইটার লেখা পড়ে আমি লিখেছি সেখানেই এই তথ্য আছে। ওই জায়গাটার নাম সেখানে ছিল তেজগাঁও। এই গহীন বনে দিনেও লোকে ঢুকত না। এটা মাত্র ১২০ বছর আগের কথা।
আরেকটা জায়গার কথা বলি, এই বইয়ে লেখা আছে, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে একটা জায়গা আছে, নৌকায় যেতে হবে। বন্য মহিষের আক্রমণে প্রতি বছর বহু লোক মারা যায়। ফলে এক মাঝি থেকে আরেক মাঝি খবর নেয় যে ওইখানে বন্য মহিষ পানিতে নামছে, কাছ দিয়ে নৌকা নিও না। এটার নাম বেলাইবিল। ১০০ বছর আগের কাহিনী বলছি। বেলাইবিলটা কোথায়? পুবাইলে।
এমনি করে আমরা পুরো দেশ কিন্তু খেয়ে ফেলব, সুন্দরবন তো কিছুই না। আপনি উপকূলেরও ওই পাশে চলে যাবেন, বন বলে কিছু থাকবে না। যেমন টঙ্গী বলে কিছু নাই, একসময় তুরাগ নদী নৌকা দিয়ে পার হতে হতো। একটা রেলওয়ে ট্র্যাক ছিল, কিন্তু সাহেবরা নৌকা দিয়ে ওই পাশে পার হতো। ওই গ্রামে ছেলেরা আসত, বিটার বলত, বাঘ জঙ্গলে বের হলেই লাঠি দিয়ে পেটাত। এটা তো সেদিনের কথা। নদীর ওই পাড়ে তো কথাই নেই। মাঝে মাঝে গ্রাম আছে, কিন্তু ওইরকম না, হিল ট্র্যাক্টসের মতো। ওরা বন্যপ্রাণীর সাথেই থাকে। গেলে শুধু বন্দুক নিয়ে যান, বিটারের কাজ করেন।
সেই টঙ্গী আমরা ঠেলে নিয়ে গেছি কোন পর্যন্ত? ঝিনাইগাতি পর্যন্ত, বর্ডার পর্যন্ত। একসময় টঙ্গী যেমন ছিল ১০০ বছর আগে, যে চিত্রটা আমি বইতে পেয়েছি এবং লিখেছি। এখন ঝিনাইগাতিতেও সেটা নাই। তার আগে পর্যন্ত পুরোটাই শহর।
ফলে আমার মনে হয় আমরা ওই অঞ্চল রক্ষা করব, এই অঞ্চল রক্ষা করব এগুলো আর আলোচনার সময় নেই। এটা কেবল অল্প জেনেই বলা যায় যে, আমাকে সুন্দরবন রক্ষা করতে হবে। কিছুই রক্ষা করতে পারব না। আমরা বলতে পারি, যেহেতু সমস্যাটা বর্তমান, কিন্তু কোনো কিছু রক্ষা করতে পারব না। সুন্দরবন পুরো শেষ করে ওই যে চরগুলো জাগছে, ওইখানেও মানুষ যাবে। ওইখানেও কারখানা হবে। কেন হবে না? কারণ আপনি ১০টা শার্ট কেনেন, ২০ বছরে বা তারও বেশি। আমরা অনেক বেশি ভোগ করি। সমস্তটাই প্রায় অপ্রয়োজনীয়। আর এটা করলেই উৎপাদন বেশি হবে, কারখানা বেশি হবে, ব্যবসা বেশি হবে।
আপনি যদি মনে করেন ব্যবসায়ীরা অযথা জমি কিনছে কারখানা বানাবে বলে, তাকে শাস্তি দিতে পারেন—যদি আপনি শার্ট কেনা বন্ধ করে দিতে পারেন। আগামী ১০ বছর শার্ট-প্যান্ট, জুতা কিছুই কিনবেন না। দেখি ওর কারখানা কেমনে চলে? তারা সব জায়গা বেচে দেবে ১০ বছর পরে।
আমি মনে করি এটা আমাদের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু আমাদের ওইভাবে ভাবতে হবে। আমরা সেভাবে না ভেবে অন্যকে দায়ী করতেই থাকি—এই খেলা চলবে। আমি প্ল্যাকার্ড নিয়ে রাস্তায় নামব, আজকের যুদ্ধ চলবেই। কিন্তু আমি ১০ বছর, ৫০ বছর কিংবা ১০০ বছরের পরের কথা ভাবছি না। ১০০ বছর পর আমার মতো লোকজন বসে বসে লিখবে যে, জানো সুন্দরবন নাকি তেজগাঁওয়ের মতো ছিল। এখানে সবার ভূমিকার কথা মনে রাখতে হবে। সেই ভূমিকা কিন্তু রাস্তায় নেমে প্ল্যাকার্ড নিয়ে নামা নয়। (আমরা) সরাসরি এতে অবদান রাখছি, বেশি বেশি ভোগ করে। এমনকি আমি বইকেও দায়ী করছি। বইও একটা উৎপাদনের জিনিস কিন্তু। বইয়ের যদি এই অবস্থা, তাহলে শার্ট-প্যান্ট তো কথাই নেই।
আমার এক পুরনো বন্ধু প্রায় ৩০ বছর ধরে আমাকে চেনে, দুই সপ্তাহ আগে আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিল। সে বলে, এনাম ভাই আপনার এই প্যান্ট ক'দিন ধরে পরছেন? আমি বললাম আপনি চিনতে পেরেছেন, ৩০ বছরেরই পুরনো। আমার বেশিরভাগ জামাকাপড় কিন্তু ২০ বছরের পুরনো। আমার বাড়তি আছে। কিন্তু সবই লোকে ডাম্প করেছে, এইজন্য বাড়তি আছে। যেদিন থেকে আমি বুঝতে পেরেছি এই খেলাটা—যে আমিই তো নষ্ট করছি! অযথা কেন অন্যকে দায়ী করব? পুরো পৃথিবী আমি নষ্ট করছি। আমার একদম সরাসরি ১০০ ভাগ ভূমিকা এর ভেতরে। অতিভোগ। বেশি রেস্টুরেন্টে যাই, বেশি খাই। ঘরে এবং বাইরেও। বেশি পরি। সবকিছু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বেশি। কারণ আমরা ভাবনাটা আগে ভাবি নি যে, এটার ক্ষতিকর দিক আছে।
এটার অনেক ভালো দিক আছে, সেটা হলো একনামে বলা যায়, প্রবৃদ্ধি। সবাই চাকরি বেশি পাচ্ছে, সবারই আয় বাড়ছে। কোথা থেকে আসছে এই ইনক্রিমেন্টটা? ৪০ হাজার পেতেন, পরের বছর ৪১ হাজার। কে দিল এই এক হাজার বাড়তি? আমার মতো মানুষ দিয়েছে। সে একটু বেশি ভোগ করেছে। আপনার টেলিভিশনটা একটু বেশি দেখেছে, খবরের কাগজের সার্কুলেশন বেড়েছে। তা না হলে আপনাকে কেউ বাড়তি টাকা দিতে পারত না। আমাদের এখন ভাবতে হবে যে, না আমার ইনক্রিমেন্ট চাই না, পৃথিবীটা টিকে থাক সেটা চাই। সুন্দরবন টিকে থাক, ঝিনাইগাতির জঙ্গলটা টিকে থাক, আমার নাতি জন্ম নিক।
একটা একটা বলার সময় কিন্তু শেষ। একটার দিকে মনোযোগ না দিয়ে, যদিও অনেকে দিচ্ছে, তারা বিশেষজ্ঞ। তারা যদি লেগে থাকেন যে আমি একটাকেও যেতে দেব না! তারা কি করে, একেবারে শেষ হয়ে যাচ্ছে—সেটাকে আঁকড়ে ধরে রাখছে। চলে গেলে তো হারানো যাবে না। তারা প্রাণপণ পরিশ্রম করে, তাদের জীবিকাই হয়ে গেছে এটা। তারা করতে থাকুক। কিন্তু আমি মনে করি, আপনার-আমার মতো মানুষ যেখানে আমাদের ভূমিকাটা আগে আসে, সজাগ হতে হবে যে, না আমি করছি ভাই। অযথা অন্যের দোষ দেওয়ার আগে আমি আমাকে ঠিক করি। দেখি পারি কি না।
পাঁচ বছর। তারপরে না হয় আমি অন্যকিছু করব। আমার মনে হয় এখন আমাদের এগুলো বলতে হবে, কেউ বলে না নিশ্চয়। আপনাদের কাছে আমি প্রথম বললাম। আপনারাও এরকম বলতে শুরু করবেন এবং ভাবতে শুরু করবেন যে, আরে আমি তো আসল কালপ্রিট। আমি ভয়ংকর অপরাধী! পৃথিবীতে এই যে ক্রমাগত ধ্বংসযজ্ঞ চলছে, এর মধ্যে আমি, আমার বাবা, আমার দাদা পুরোপুরি ছিল। ওদেরকে ক্ষমা করা যায়, কারণ ওরা জানত না, কিন্তু আমি ক্ষমা পাব কীভাবে?
এভাবেই ভাবতে হবে আর উপায় নেই। অনেক দেরি হয়ে গেছে। এর আগে বহু লোক ভেবেছে এভাবে, বলেছে আমাদের, আমরা শুনি নি। এখন মাথার ওপরে যখন এসে পড়েছে, একেবারেই, আমরা জানি যে এখন মরতে যাচ্ছি! ১০০ বছরের বেশি টিকব না। এই গতিতে গেলে আরও কম। অনেকে বলছে যে গতিটা একটু কমাতে হবে, রোধ কেউ বলার সাহস পায় না। গতি একেবারে রোধ করাতে হবে। দেখবেন পাঁচ বছরের মধ্যে বলতেই হবে।
প্রশ্ন : জানতে চাচ্ছিলাম বাংলাদেশের পাখি বা বন-জঙ্গল নিয়ে। আপনার এসব কথার পরে বাদ দিলাম বিষয়টা। আপনি কি পৃথিবীর ভবিষ্যত নিয়ে আশাবাদী?
উত্তর : হ্যাঁ, আমি আশাবাদী। আমি নিজে আশাবাদী লোক। আশাবাদ আসে কোথা থেকে? কারণ এর আগেও আমরা এভাবে পার হয়ে এসেছি। মানুষ শেষ পর্যন্ত কিন্তু ভালোটাই করেছে। অনেক ধ্বংস করেছে, কিন্তু তারপরে আবার বুঝে গেছে। আপনি জানতেন আমরা একসময় যুদ্ধ করতাম? আপনি শুনেছেন ইতিহাসে। যুদ্ধ ছাড়া কোনো দেশ ছিল না। একটা যুদ্ধের নাম ছিল হান্ড্রেড ইয়ার ওয়ার। ১০০ বছর ধরে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ করেছে। কোথায় গেছে যুদ্ধ? বিশ্বযুদ্ধে কতগুলো দেশ যুক্ত ছিল!
এখন কিন্তু ওরকম যুদ্ধ হয় না। কেউ মনে করে না যে যুদ্ধ না করে মানুষ থাকবে কি করে। এত যুদ্ধ-যন্ত্র, এত কোম্পানি, এত ট্রেনিং, এত মিলিটারি, পুরো অর্থনীতি যুদ্ধভিত্তিক। চলে গেছে কিন্তু। যুদ্ধভিত্তিক অর্থনীতি নাই, যুদ্ধ শুধু আমেরিকা চালায়। এখনও তারা অস্ত্র বানিয়েই ধনী দেশ হওয়ার চেষ্টা করছে। অস্ত্র বেচেই সম্পদ করতে পেরেছে। তখন কিন্তু একথা কেউ বিশ্বাস করত না।
১৯৪৫ সালে যদি বলতেন যে, না মানুষ যুদ্ধ করবে না। আপনাকে বলত—পাগল আপনি? কমবে বা বাড়বে, জিনিস যাবার নয়, একই ব্যাপার। এখন আপনি ভাবছেন শার্ট কেনা বন্ধ করবে মানুষ? অসম্ভব। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, মানুষ আসলেই করে; শেষ মুহূর্তে ধরে কিন্তু পারে। নইলে আমরা এত দূর আসতাম না। বহু আগেই ধ্বংস হয়ে যেতাম। সভ্যতা ধ্বংস হয়েছে, মানুষ হয় নি। সভ্যতা ধ্বংস কিছুই না, তুচ্ছ। ধরুন অমুক শহরের কাজ শেষ হয়ে গেছে, কিছুই এসে যায় না। কাজ তো পৃথিবীতে অনেক আছে। মানুষ টিকে থাকলেই হলো এবং আছে, তাই না? আমরা কিন্তু এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি যেখানে যুদ্ধ প্রায় অসম্ভব। যুদ্ধ হলেও কয়েকদিন পর বন্ধ হয়ে যাবে।
প্রশ্ন : আশা করি যুদ্ধবিহীন বিশ্ব বেশি দূরে নয়, আপনি নিশ্চয় দেখবেন।
আপনার এত দীর্ঘ জীবন, এত সুঠাম এবং এত কর্মক্ষম কীভাবে আছেন?
উত্তর : এটা তো আমি জানি না। ওটা আমি তো করি নাই। আমি দায়ী না এজন্য। এটা বোধহয় আপনিই ঘটেছে। সজ্ঞানে, সযত্নে করেছি তা নয়। লাইফস্টাইলের সঙ্গে হয়ত কিছু সম্পর্ক আছে। আমি কোনো কিছুই কঠিনভাবে করি নি। আমি অনেক ঢিলেঢালা, খোলামেলা কিছু কাজ করেছি। আমি কিন্তু লক্ষ্য সামনে রেখে কিছু করার লোক না। করলাম, কিছুটা হলো কিছুটা হলো না। চমৎকার জীবন। আমার গ্লানি একটাই, আমি বোধহয় বেশি ভোগ করে গেলাম। এইটুকু নিয়ে আমার অনুশোচনা যে, আমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন ঠিক আমার মতো ফুর্তিতে কাটাল না। তাহলে কি আমি আবার কারো ভাগ খেয়ে ফেললাম।
প্রশ্ন : আপনি কোনো একসময় বোধহয় নিরামিষাশী ছিলেন। কোন সময়টা, কেমন ছিল ফিলিংটা?
উত্তর : ১৩ বছর নিরামিষাশী ছিলাম। ১৯৮৫ থেকে শুরু করে ১৯৯৮ পর্যন্ত কোনো মাছ, মাংস, ডিম খেতাম না। করে দেখলাম, সবকিছু করা যায়। এমন কিছু না। উপকারই হয়েছে। ওভাবে খেলে অনেক ভালো থাকা যায়। এখন আমি যেমন কোনো ভাত খাই না। কার্বোহাইড্রেট কমিয়ে দিয়েছি। ভাত, মিষ্টি খাই না। দিনে একবার খাবার খাই।
প্রশ্ন : নিরামিষভোজী হয়েছেন ইচ্ছায়, আমিষভোজীও হয়েছেন ইচ্ছায়, পার্থক্যটা কেমন? কোনটা ভালো লেগেছে?
উত্তর : সবগুলোই ভালো লেগেছে। সবাই করতে পারে? আসল বিষয় হলো কোনটা খাচ্ছেন তা নয়, কি পরিমাণে খাচ্ছেন সেটা। পরিমাণ যদি না কমান, আপনি আমিষ বা নিরামিষ যাই-ই খান না কেন, অসুবিধা হবেই। ওজন বৃদ্ধি হবে। নিরামিষভোজী হয়ে ওভারওয়েট হওয়া কঠিন, কিন্তু হতে পারেন। কিন্তু ভাত খেয়ে ওভারওয়েট হবেন খুব দ্রুত। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বললে, কম খাওয়া এবং কম সময়ে ধরে খাওয়া। ২৪ ঘণ্টায় যদি আপনি ১২ ঘণ্টাই খান, কম খেলেও ক্ষতি। এই সময়টা কমিয়ে আনতে হবে। তাহলে আপনার না খাওয়ার সময়টা বেশি হবে। না খাওয়াটা শরীরের জন্য অসাধারণ উপকারি। এটা আগে জানাও ছিল না। গত ২০ বছর ধরে লোকেরা গবেষণা করে বের করে, নোবেল-টোবেল পেয়ে বিখ্যাত করে ফেলেছে। আমাদের দেশের লোক এখনও জানে না।
আপনি কি খাচ্ছেন, কতটুকু খাচ্ছেন এই দুটোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ আপনি কত সময় ধরে খাচ্ছেন। আপনি দিনের ১২ ঘণ্টাই যদি খান, আপনি ক্ষতি করছেন। কারণ আপনি মাত্র ১২ ঘণ্টা না খেয়ে থাকছেন। এই না খেয়ে থাকার সময়টা বাড়াতে হবে। আপনি রাত ১০টায় খেয়ে আবার সকাল ৮টায় খেলেন, তাহলে আপনার না খাওয়ার সময়টা খুব কম হয়ে গেল। আপনি যদি মনে করেন ৬টার পর আর খাব না, আবার সকালের নাস্তা ১০টার আগে খাব না, তার মানে আপনি সকালের নাস্তাটা স্কিপ করছেন, অনেকেই করে। আপনার না খেয়ে থাকার সময়টা বড় হয়ে গেল। এটা সাংঘাতিক ভালো। এটা গত ২০ বছরে জানা গেছে।
কিন্তু যেকোনো কিছু জানলেই যথেষ্ট নয়, বহু মানুষের যেতে সময় লাগে এবং যতদিন না যায় উপকারটা তারা পায় না। না খাওয়ার সময়টা বাড়াতে হবে সজ্ঞানে। না খেয়ে থাকার সময়ে কিন্তু শরীর নিজেকে তৈরি করে। ’রি-বিল্ড’ মানে নবজীবন দেয়। আপনি খাওয়ার পরের চার ঘণ্টা ধরে আপনার শরীর খাচ্ছে, মানে হজম করছে। শুধু পানি বা চা এগুলো বাদ। আমি কিন্তু পানি ও চা ছাড়া কিছুই খাই না চারটার পরে। তবে এটা আমি বহুকাল ধরে করছি তা নয়, সম্প্রতি। করোনা মহামারির সময় এগুলো আমাকে শিখিয়েছে। এটা প্র্যাকটিস করা কঠিন, করোনায় সোজা। আপনি কোথাও যাচ্ছেন না, ফলে কোনো বালাই নেই।
আপনাকে যদি মাসে তিন বার নিমন্ত্রণ খেতে হয় তিন বাড়িতে, অবশ্য না বলা কঠিন, কারণ আমার চর্চাটা ভেঙে গেল। কিন্তু করোনা আবার সুযোগ করে দিয়েছে। সব ধর্মেও কিন্তু এটার চর্চা আছে। ধর্ম এসেছে প্রাচীন মানুষের আচার থেকে। তারা বহুদিন বহু করে দেখেছে আরে এটায় লাভ আছে। আমরা জ্ঞান দিয়ে যতটা জানি, সেটা কম সময়ে জানা যায়, ওদের একটা সুবিধা ছিল। ওরা এক লাখ বছর ধরে ওগুলো শিখেছে, পরম্পরার মাধ্যমে। ওইগুলোই হলো আচার। সেখান থেকে ধর্ম এসেছে কিন্তু ওইরকম মানুষ থেকে। ধর্ম কোনো পণ্ডিত বানায় নাই, গ্রামের গণ্ডমূর্খরা বানিয়েছে। ফলে ধর্মের মধ্যে কিন্তু ওইসব আচারগুলো রয়ে গেছে, যেগুলো বেশ ভালো। সব ধর্মেই।
প্রশ্ন : ব্যবসা থেকে আপনি যখন ইস্তফা দিলেন, আপনি একবার বলেছিলেন যে অনেক কাজ জমে আছে, অনেক বছর ধরে। সেই জমে থাকা কাজ কতটুকু শেষ করেছেন? আর কতদিন করতে হবে?
উত্তর : কাজ মানে যেগুলো কোনোদিন শেষ হয় না। পড়া, লেখা এইসব। ওইগুলো তো সত্যিই করি নি। যখন আমি চাকরি করেছি, ব্যবসা করেছি, তখন তো লিখি নি। ব্যবসার পাশাপাশি শুরু করেছিলাম—যেহেতু আমাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার কাজটা দিয়েছিল এশিয়াটিক সোসাইটি। আমি দুই নৌকায় পা রেখে চেষ্টা করেছিলাম। পরে দেখলাম হবে না, আমি ২০০৩ সাল থেকে এশিয়াটিক সোসাইটির কাজে যোগ দিয়েছি, ২০০৫ সালেই আমি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছি। লেখালেখি শুরু করলাম। সেইগুলো আমার কাছে উপভোগ্য। ব্যবসার চেয়ে তো অনেক বেশি। এবং এই কাজ শেষ হওয়ার মতো নয়।
প্রশ্ন : এশিয়াটিক সোসাইটির ওই অংশে দায়িত্ব বোধহয় ছিল পাখি নিয়ে...
উত্তর : হ্যাঁ, পাখি নিয়েই করেছি। ওটা বহু আগেই শেষ হয়েছে। আমি খুবই খুশি ছিলাম কাজটা নিয়ে। আমার সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল এটাই।
প্রশ্ন : কাজ কি এভাবেই চালিয়ে যাবেন?
উত্তর : এগুলো ঠিক কাজ না। এশিয়াটিক সোসাইটি যখন আমাকে ডেকে বলল যে আপনি এটার সম্পাদক হবেন, তখন তো আমি অভিভূত হয়েছিলাম। কিন্তু যখন তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসলাম তখন আমি আপত্তি করলাম যে আমি এটা টাকার বিনিময়ে করব না। অগাধ টাকা ওখানে। কিন্তু ওনারা বললেন যে, না না এটা ছাড়া তো হবে না। আমাদের এটা সরকারি প্রজেক্ট তো। আমাদের তো টাকা দিয়েই লোক নিতে হবে। আপনি না নিতে পারেন, কিন্তু আমরা এরকম কোথাও লিখিত দিতে পারব না যে আপনি এটা সম্পূর্ণ ফ্রিতে করছেন; এরকম কোনো ব্যাপার নেই এখানে।
সেইজন্য আমি কাজ বলছি না। কাজ হলো টাকার বিনিময়ে। যেটা করে আপনি আরও টাকা দিতে চান, এরকম বই ছাপানোর টাকা আমি আমার পকেট থেকে দিতে রাজি। সেটাকে কি কাজ বলবেন? আমি এখন ওইরকম কাজ করি যেখানে টাকার জন্য না, বরং ওই কাজটা করে আমি আরও টাকা দিতে রাজি।
প্রশ্ন : সেটাই কি আপনার ‘এইমলেস’ আনন্দের উৎস নাকি?
উত্তর : না না। সবকিছুতেই আনন্দ আছে। আমি এত বছর চাকরি করেছি, মহা আনন্দে কাজ করেছি। এই যে আজকে আড্ডায় বসেছি এটা একটা বিরাট আনন্দের ব্যাপার না? হয়ত জীবনে আর কখনো এভাবে বসা হবে না। তাহলে কত বিরল এটা! আমি সবসময় এভাবেই ভাবি।
প্রশ্ন : আরেকটা বিরল ব্যাপার বোধহয় আপনার ভেতর আছে যে আমরা ৬ জন যদি আজকে এভাবে না বসতাম তাহলেও আপনি সমপরিমাণ আনন্দেই থাকতেন।
উত্তর : কোনো সন্দেহ নেই। ভিন্ন রকমের, তাই বলে এরকম না যে এটায় বেশি আনন্দ, ওটায় কম।
প্রশ্ন : একই সঙ্গে আপনি খুব বন্ধুবৎসল, আবার বোধহয় নিঃসঙ্গতাও পছন্দ করেন---
উত্তর : হ্যাঁ, ঠিক তাই। নিঃসঙ্গতা বলে কিছু নেই। আপনারা না থাকলে আমি কেমন করে নিঃসঙ্গ? আমার মাথা স্মৃতি দিয়ে ভরতি, আমার পাশে বই আছে, ছবি আছে, চিন্তা আছে সারাক্ষণ। আমাকে ৫০০ বছর এক দ্বীপে রেখে দেন, মহা আনন্দে থাকব। যদি আমার পুরনো অভিজ্ঞতা থাকে, ওই যে স্মৃতিগুলো—কোথায় যাবে? আমার সাথে থাকবে না?
প্রশ্ন : আপনি বোধহয় প্রচলিত অর্থে ঠিক বাঙালি নন। বাঙালি বলতে লোকে বুঝত জীবনে কত বছর ঘরসংসার করেছি বা বউ-পোলাপানের ব্যাপার। ওইটা হচ্ছে একাকীত্ব বা নিঃসঙ্গতা। আনন্দ, কাজ ওই অর্থে না। আপনি বোধহয় প্রচলিত বাঙালি-অর্থে একটা লম্বা সময় একাকী কাটিয়েছেন। মানে সাংসারিক অর্থে। আমি জানি না যে, কর্মজীবনে আসার পর আপনার সখ্য নিঃসন্দেহে ছিল, কিন্তু একই পরিবারের শারীরিক উপস্থিতি বোধহয় কম ছিল। কেমন লেগেছে এই অনেকটা সময় নিজের সাথে থাকা? মনে হয় নি যে নিঃসঙ্গ বোধ করছেন কখনো? পরিবার বা মানুষ দরকার এন্টারটেইন হওয়ার জন্য? বা সঙ্গ যেটা...
উত্তর : না কোনোদিন মনে হয় নি। আপনি হয়ত নারীসঙ্গের কথা বলতে চাইছেন। ওইটা বলতেও পারেন। নারীসঙ্গের একটা তাগিদ আছে কিন্তু। জৈবিক, প্রাণীমাত্রেই আছে। খুবই তীব্র। যেকোনো প্রাণীর কিন্তু দুটো জিনিস প্রথমেই লাগবে—খাবার লাগবে বেঁচে থাকার জন্য এবং যৌনতা লাগবে টিকে থাকার জন্য। যৌনতা ছাড়া ব্যক্তি টিকে থাকবে, কিন্তু গোষ্ঠী তো টিকে থাকবে না। ফলে ওটা খাবারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিকভাবে তাগিদটাও শক্তিশালী। সেজন্য ওটা আপনার বিকৃতি নয়। বরং আমরা যদি ওইটা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করি, সেটাই বিকৃতি। প্রাকৃতিক হলো যৌনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া। প্রকৃতি আমাদের ওইভাবেই বানিয়েছে। আমাদের ভেতরে তাগিদগুলো অতোই শক্তিশালী। কিন্তু সুবিধা হলো ঠিক খাবারের মতোই। কিন্তু এটা ইন্টারমিটেন মানে সারাক্ষণ লাগে না। একটু লাগলে আবার অনেকক্ষণ পর সেই চাহিদাটা দেখা যায়। তার ফলে আমরা নিয়ন্ত্রণও করতে পারি।
আমরা খাবার জন্য যেমন রোজার কথা বললেন, না খাওয়ার সময়টা যদি বাড়াতে পারি, যৌনতার ব্যাপারও একই। তার মানে আমাদের ভেতরে নিয়ন্ত্রণটাও রয়েছে। এবং সেই নিয়ন্ত্রণ আমরা প্রয়োগ করতেও পারি। আবার ওটাও তো মজার, তাই না? অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করছি। আপনার মজাই তো দরকার। ওখানেও যেমন মজা, এখানেও তেমনই। খাবার এবং যৌনতা দুটোর মধ্যেই একটা মিল আছে, সুখটা সাময়িক। অত্যন্ত সাময়িক। পাঁচ মিনিটের পর কিছুতেই থাকবে না। যতোই খেয়ে মজা পান না কেন, পরে সেই দারুণ লাগা কিন্তু থাকবে না। ফলে আমাদের বিরাট নিয়ন্ত্রণ আছে, খাবারের ওপরেও, যৌনতার ওপরেও। অনেকে আবার ওইটা হারিয়ে ফেলে, অনেকে জানেই না এবং প্রয়োগও করে না। প্রয়োগের সুখটাও জানে না।
সেজন্য আমি বলি খাওয়ায় যেমন মজা আছে, রোজা থাকায়ও মজা আছে। যে আমি খাচ্ছি না। ৩ দিন খাই না, অনেকে এটা করতেই পারবে না। এখন অবশ্য পশ্চিমের অনেকে এবং অ্যাথলেটরা অনেকেই ১০ দিন না খেয়ে থাকে প্রতি ৩ মাসে এবং খুবই ভালো থাকে। এটা ভিন্ন বিষয়। আমি যেটা বলছি এই যে দুইটা বিষয়, যেহেতু আমাদের ভেতর তাগিদ আছে, তবে দুইটাই একটু সময় পরে আসে বলে মাঝখানে আমাদের হাতে নিয়ন্ত্রণ থাকে। নিয়ন্ত্রণ আছে বলেই আমরা নিয়ন্ত্রণটা প্র্যাকটিসও করতে পারি। এটার মধ্যে আনন্দও আছে। ফলে ওইটা কোনো ব্যাপার নয়। আমার মনে হয় যারা এটা জেনে শুরু করেছে তাদের কাছে ওইটা খুবই আনন্দময়। বহু লোক আছে পৃথিবীতে যারা সারা বছর রোজা রাখে, যৌনতার দিক থেকে বন্দি থাকে। কোনো অসুবিধা নাই। আমি বলব তারা দারুণ আনন্দে আছে। তারা কোনোকিছু থেকেই বঞ্চিত না। একটা থেকে বঞ্চিত হলেও, অন্যটা তার নিয়ন্ত্রণের যে আনন্দটা, সেটা কত শক্তিশালী এবং ভালো!
তো আমার জীবনেও ওইটাই, আমার কোনো অসুবিধা কখনোই হয়নি। মহা আনন্দে ছিলাম, নিয়ন্ত্রণ করেই। নিয়ন্ত্রণের আনন্দটা আমিও কিছুটা হলেও ভোগ করেছি। আর এমনি মানুষের সঙ্গ যদি বলেন, এই সঙ্গটা এমনই সঙ্গে থাকলেই উপভোগ করা যায়। না থাকলে অভাববোধ খুব বেশি না। এটা সত্যি কথা। যারা অভাববোধ করে তাদের অন্য কোনো ঘাটতি আছে। নইলে কেন করবে? আমি সামনে গেলে আপনার অনেক ভালো লাগছে, আমি চলে গেলে মনমরা হয়ে গেলেন? অদ্ভুত ব্যাপার না? মানে আপনি আমার ওপর নির্ভরশীল, যে আমাকে দেখতেই হবে বা আমার স্পর্শ পেতে হবে, আমার কথা শুনতে হবে? শিশুরা ছাড়া এত নির্ভরশীল তো অন্য কেউ নয়। আমি মনে করি ওইরকমভাবে যদি কেউ লিখে তাহলে সেটা মজা করার জন্যই। সত্যি হলে এটা ভয়ঙ্কর। তার চিকিৎসা প্রয়োজন।
প্রশ্ন : ছোট্ট করে একটা প্রশ্ন করি, জীবন মানেই তো ভ্রমণ আসলে। পরিকল্পনা করে, প্রয়োজনে, জীবিকার ক্ষেত্রেও। পাখি-প্রকৃতি, পাহাড়, এভারেস্ট, সাগর বিভিন্ন মাত্রায় আসলে আপনি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েছেন জীবনে। ভ্রমণের এই যে বহুমাত্রিকতাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
উত্তর : আমি ওইভাবে মাত্রা হিসেবে দেখি নি তো। এখন হয়ত পেছন ফিরে দেখতে পারি যে, ও, সেগুলো মাত্রিক হয়েছে। এটা একটা যাত্রা তো, তাই না? এক যাত্রায় আপনি পানিতে বা কাদার মধ্যেও নেমেছেন, লাফ দিয়ে পার হয়েছেন কিছু, এগুলো ভিন্ন ভিন্ন করে দেখা যেতে পারে, কিন্তু ওইভাবে আমার জীবন যায় নি। জীবনের পথে অনেক কিছু ঘটে গেছে। আমার মনে হয় এর চেয়ে ভালো করে বলতে পারি না।
প্রশ্ন : ইনাম ভাইয়ের সব বিষয়ের সঙ্গে একমত হলেও একটা বিষয়ে একমত না যে, ছয়জন হয়ত নয়, কিন্তু কম-বেশি করে আবার আমরা একত্রিত হব। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
উত্তর : আপনাদেরও ধন্যবাদ।