বাবুরাম সাপুড়ে
লেখাঃ চরন্তি ডেস্ক
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২মুঠোফোনটা ‘নিঃশব্দে’ কেঁপেই চলছিল, আমি ডুবে আছি জটিল অংকে। সপ্তাহব্যাপী সার্ভে কাজের ফলাফল অ্যাডেলেইড হিলস-এর ‘কব্লারস রিজার্ভ’ (Cobblers Reserve) পাহাড়ি-জঙ্গল অঞ্চলে, আজকেই প্রজেক্ট সাবমিশন। এটা বউয়ের ফোনকল, শুধু বলব—‘মহা ব্যস্ত আছি’, হ্যালো বললেও আমার চোখ অংকের খাতায়। আচমকা সম্বিত ফিরে পাই—‘সাপ! বাসায় এইমাত্র একটা সাপ দেখলাম’—এই কথা শুনে! গলার স্বরে বুঝতে পারি, ঈশিকা রীতিমত কাঁপছে ভয়ে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
আমার প্রশ্নের তুবড়ির সিকিভাগ উত্তরও দেবার পরিস্থিতি নেই। ভাঙা ভাঙা শুনে বোঝা গেল, রান্নাঘর থেকেই পাশের লন্ড্রিরুমের ভেতর আওয়াজ পেয়ে, কিছু একটা নড়তে দেখে দৌড়ে বাসা থেকে বের হয়ে এখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে সে। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়া থেকে নিজেকে উদ্ধার করে, ছুটে আমাদের সার্ভে ডিপার্টমেন্ট-হেডের দরজায় টোকা দিলাম, দরজা খুলতেই জিজ্ঞেস করলাম—বাসায় সাপ ঢুকলে তোমরা এই দেশে কী করো বলতে পারো?
আমার এই শিক্ষক মহোদয়ের অভিজ্ঞতা আর প্রজ্ঞার উপর আমার অগাধ সম্মান আছে; হাজার হোক ৩০ বছরের সার্ভেয়ারের চাকুরি জীবনে মধ্য-অস্ট্রেলিয়ার বিরানভূমিতে (Australian Outback) কাজ তো করেছেনই, এছাড়াও ইউরোপে উত্তর সাগরের (North Sea) তলদেশের মানচিত্র তৈরির কাজ থেকে নিউজিল্যান্ডীয় দক্ষিণ আল্পস (Southern Alps)-এর চূড়ার ভূতাত্ত্বিক মাপজোকও করেছেন কয়েক বছর। উত্তর এলো—‘তুমি সিটি কাউন্সিলে ফোন করো, ওরা সাপুড়ে জোগাড় করে দেবে।’ আমি বউকে সাপুড়ের খোঁজ দেওয়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে বাসায় সাপুড়ে এসে হাজির। আমি উদ্বিগ্ন হয়ে ঈশিকাকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে চলেছি— ‘তুমি কি একা সামাল দিয়ে পারবে? সাপটাকে খুঁজে পাবে তো? যদি না পায় আমরা কি সাপসহ বাড়িতে রাতে ঘুমাব? একটাই সাপ তো, না কি?’ ‘যাক বাবা, বাঁচা গেছে, অন্তত যারিয়া এখনো স্কুলে’—এইসব হাজারো চিন্তা করতে করতে অঙ্কের রণাঙ্গনে ফিরে গেলাম। আমার যে আজকে প্রজেক্ট শেষ না করলেই নয়!
প্রসঙ্গত বলে রাখি, চলতি বছরে সূর্যের শারদীয় বিষুবায়ন থেকেই (21st September, Equinox) আশেপাশের অনেকের কাছ থেকে ‘সাপখোপ শীতনিদ্রা থেকে বেরিয়ে আসছে’ এমনটাই শুনছি ফি-বছরের মতো। আমার সার্ভে পড়ালেখার প্রজেক্টের কাজে অ্যাডেলেইড হিলস-এরই দক্ষিণে একটা সালফারের খনিতে এক সপ্তাহ থাকলাম। কাজ চলাকালে কয়েকজন ‘ব্রাউন স্নেক’ দেখা গেছে বলে জানাল। আমি এখন পেশাগতভাবেই যেহেতু পাহাড়, জঙ্গল, রাস্তা, শহর বন্দরের মানচিত্র তৈরি করি, গুগল করে স্থানীয় ‘সাপ-ব্যাঙ-বিচ্ছু’র সম্বন্ধে জেনে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলাম। চমকে নিজেকে বললাম—‘সব্বোনাস! অস্ট্রেলিয়া না দুনিয়ার সবথেকে বিষধর সাপের আবাসস্থল!’
এত যে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির ডকুমেন্টারি দেখলাম এদের সম্বন্ধে, এখন সামনাসামনি পরিস্থিতি মোকাবেলা করার সময় হয়েছে। ডক্টর জাফর ইকবালের ভূমিকম্প নিয়ে পড়াশোনা করে ভূমিকম্প সম্পর্কে ভয় কাটানোর গল্প মনে পড়ল। জানলাম যে ‘ব্রাউন স্নেক’ অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ভয়ঙ্করতম বিষধর সাপ যা পুরো সাউথ অস্ট্রেলিয়া জুড়েই আছে, এবং খোদ অ্যাডেলেইড শহরেও এর আবাসভূমি! কিন্তু খুবই মুখচোরা স্বভাবের এই সাপ; বলা হয় এরা মানুষকে এড়িয়ে চলে, যতটা মানুষ এদেরকে এড়িয়ে চলে, তার থেকে বেশি। আর তাই পুরো অস্ট্রেলিয়া জুড়েই বছরে মোটে ৫টারও কম সাপে কাটার ঘটনা ঘটে, যেখানে ভারতে ঘটে ৫০ হাজারের মতো! কিছুটা আশস্ত হলাম, প্রাণপ্রিয় জাফর ইকবালের মতই চিন্তা করে, ‘জ্ঞানের চেয়ে বড় বন্ধু কেউ নেই।’
বাসায় খোঁজ নিয়ে জানলাম সাপুড়ে কিছু পায় নি, ফিরে চলে গিয়েছে। আবার অঙ্কে মনোনিবেশ।
‘সাপ এখনও আছে! আমি মাথা দেখতে পাচ্ছি, উফফ, কী যে ভয়ঙ্কর! নেটের দরজার বাইরে বলে একটু ভালোমতো দেখে নিচ্ছি।’ আবার সাপুড়েকে ফোন, একই সঙ্গে প্রজেক্টের সময়সীমা বর্ধিত করাতে অঙ্ক কষার রণে ভঙ্গ দিয়ে যুদ্ধবিরতিতে আমি। বাসার পানে ছুটে চললাম। ততক্ষণে যারিয়ার স্কুল ছুটির সময় হয়ে গেল বলে, প্ল্যান হচ্ছে যারিয়াকে কাছের এক বাঙালি প্রতিবেশীর বাসায় রেখে এসে ‘সর্প-উপস্থিতি’ পরিস্থিতি সামাল দেব।
একফাঁকে আমার সান্ধ্যকালীন খণ্ড চাকুরির রেস্তোরাঁর মালিককে ফোন করলাম। মারিওর কাছে এই সপ্তাহ দুয়েক আগে তার বাড়িতে ‘ব্রাউন স্নেক’ নিধনের গল্প শুনেছি। অ্যাডেলেইড হিলসেই ওর ২৫ একরের খামারবাড়ি; তাতে ভেড়া, ছাগল, কুকুর, বেড়াল, দক্ষিণ আমেরিকার লামা, বল্গা হরিণ কী নেই, বলা চলে ‘অভয়-অরণ্য’, সাপখোপ তো উপড়ি!
—‘বস, কারবোলিক এসিড কই পাব বলো তো?’ জিজ্ঞেস করলাম।
—‘প্রথমে বলো তোমার ছোট্ট মেয়েটি কোথায়? সাপুড়ে দিয়ে সাপ তাড়িয়ে এরপর মেয়েকে বাসায় নিও, কামড় খেলে যে মারা যাবে বুঝতে পারছো তো?
আর শোনো, যদি সাপুড়ে আসার আগেই তুমি খুঁজে পাও তাহলে বেলচা বা গাঁইতি দিয়ে এক কোপে মাথা আলাদা করে ফেলো। থানা-পুলিশ-কেস সেসব পরে দেখা যাবে!'
‘ব্রাউন স্নেক’ নিধন আইনগতভাবে অস্ট্রেলিয়াতে নিষিদ্ধ।
আমি বাসায় ফিরে গেটের সামনে ঈশিকার কাছে যারিয়াকে রেখে জুতা পাল্টিয়ে বুট পরে নিলাম। ধুপ ধাপ আওয়াজ করে একটা লাঠি নিয়ে সাবধানে রান্নাঘর থেকে নেটের দরজা দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই সাপুড়ে এসে হাজির। ওকে দেখে সাহস পেয়ে ওর সঙ্গে মালপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করতে সাহায্য করলাম।
সাপও নেই, তার টিকিও নেই।
—‘নাহ! এখানে কিছুই নেই। আমাকে বলো তো, কী দেখেছ এবারের বার?’ সাপুড়ে জিজ্ঞেস করল।
আমি দ্বিতীয়বার সর্প দর্শনের যা বর্ণনা শুনেছি, তাই জানালাম।
সাপুড়ে ইশারায় হাত দিয়ে ব্যাস আর দৈর্ঘ্য দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল—
‘তুমি বলছো এতটুকু মোটা আর এত লম্বা সাপ। আমি নিশ্চিত ওটা ‘নীলমুখো গিরগিটি’ (Blue tongue lizard)। এই অঞ্চলে অনেক আছে। এই গরমে তোমার লন্ড্রিঘরের অন্ধকার ছায়ায় বিশ্রাম নিতে এসেছিল, কখন সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেছে।’
সাপুড়ে লোকটি বেশ ভালো, ওর নাম ব্রুস। সে আমাদেরকে ওর মুঠোফোনে কিছু ছবি দেখাতেই ঈশিকা চেঁচিয়ে বলল ‘এই যে, একদম এইরকম দেখতে!’
—‘দেখতে ভয়ানক হলেও এরা আসলে নিরীহ প্রাণী’, ব্রুস জানাল।
এরপর ব্রুসের সঙ্গে ব্রাউন স্নেক নিয়ে অনেক কথা হলো। কবে ডিম পাড়ে, কত বছর বাঁচে, কত লম্বা হয়, ইত্যাদি। বলল ওর সংগ্রহে একটা আছে, দেড় ফুটের মতো লম্বা, আর আঙুলের মতো চিকন। এশিয়া অঞ্চলের সাপ নিয়েও কথা হলো। বাংলাদেশের রাজগোখড়া (King Cobra) আমার কাছে ‘ভয়ংকর সুন্দর’ লাগে শুনে ব্রুসও সহমত পোষণ করল। আমি ভাবলাম এই রূপের কারণেই কি সাপ নিয়ে এত গল্প, রূপকথা, অলীক ভাবনার জন্ম?
আমি যখন সাহায্য চেয়ে খোঁজ করছিলাম, তখন ইংরেজিতে সাপুড়েকে ‘স্নেক ক্যাচার’ (Snake Catcher) বলে বুঝলাম, বাংলাদেশে কিন্তু আমরা বেদে বা সাপুড়েকে Snake Charmer বলে ভাষান্তর করি। ব্রুসের তো আর সাপের বীণ নেই, নেই কোনো সাপকে নিয়ে চমৎকার সুর আর বেহুলা-লক্ষিন্দরের গান। হয়তো ব্রাউন স্নেক-এর মুখচোরা স্বভাবের কারণেই এত সাদামাটা সবকিছু।
আতঙ্ক আর ভয় কিছুটা কাটার পর আমি সাপ-সংক্রান্ত জরুরি কিছু ব্যাপার আলোচনা করার চেষ্টা করি; সাপে যদি ঘটনাক্রমে কাটে, প্রতিষেধক (anti-venom) দেওয়ার জন্য ওটা কোন সাপ তা জানা চাই, আর তার জন্য ভয়কে কিঞ্চিত হলেও জয় করে সাপটাকে দেখে মনে রাখা চাই। এটা পারতেই হবে যে!
ঈশিকা কটমট করে চোখ পাকিয়ে বলে—‘হুঁহ! একেবারে বইয়ের ভাষায় কথা বলছ এখন, তুমি একা বাসায় থাকলে কী করতে শুনি?’
—‘আমি? আমি আর কি করতাম! তোমারই মতো একদৌড়ে ঘরের বাইরে চলে যেতাম! বাবুরাম সাপুড়েকে খোঁজ করতাম!’
এই ক্ষুদ্র জীবনে বনেবাদাড়ে যতটুকুই যাওয়া হয়েছে, বন্যপ্রাণীকে নিয়ে আমি যতটা না চিন্তিত থাকি, মানুষের শহরে মানুষরূপী জানোয়ারদের নিয়ে আমি তার থেকে বেশি বিমর্ষ থাকি!
পরিশিষ্ট : বেঁচে থাকুক বিষধর ব্রাউন স্নেক, বেঁচে থাকুক আমাদের অনাকাঙ্ক্ষিত অতিথি নীলমুখো গিরগিটি, বেঁচে থাকুক বাংলাদেশের ভয়ংকর রাজ-গোখরা। জয় হউক মঙ্গলময় জীব-বৈচিত্র্যের।
লেখক : শাহরিয়ার রহমান, সার্ভে স্টুডেন্ট, টেফ (টেকনিক্যাল অ্যান্ড ফারদার এডুকেশন, সাউথ অস্ট্রেলিয়া)
নীলমুখো গিরগিটি (Blue tongue lizard) ছবি সংগৃহীত,
সাপুড়ে ব্রুস আমাকে কীভাবে সাপ ঝোলাতে আটকাতে হয় তা দেখাচ্ছে ।