পাবনার বিবিসি বাজার : মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় স্মৃতি
লেখাঃ সৈয়দ রুমী
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২লেখাঃ সৈয়দ রুমী
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২বিশ্বজুড়ে যত গণ মাধ্যম; তার মধ্যে আজ অবধি সংবাদ প্রচারে বস্তুনিষ্ঠতায় গণমানুষের প্রিয় বলতে গেলে একবাক্যে সবাই বলবেন ‘‘বিবিসি’’।
অথচ ভাবা যায় কী জায়গার নাম বিবিসি থেকে বিবিসি বাজার। তা লন্ডনে নয়; খোদ পাবনার ঈশ্বরদীর রুপপুরে। - না এখানে কোন বেতার কেন্দ্র কিংবা বেতার উপকেন্দ্রও নেই বা কর্ষিণকালেও ছিলনা ।
এ নাম করণের পেছনে কেবলই আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ আর সেই যুদ্ধে বৃটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি)-এর গৌরবময় স্মৃতি বিজড়িত।
যা ধারণ করে আজও দীপ্তমান পাবনা জেলায় অবস্থিত বিবিসি বাজার। এটি মূলত ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপূর বাজারের নাম পাল্টে হয়েছে বিবিসি বাজার। সময়ের সাথে সংযুক্ত হয়ে। এই বাজারের নেপথ্য নায়কের নাম আবুল কাশেম মোল্লাা। ৭৫ বছর বয়স্ক কাশেম মোল্লা আজ নেই।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ঈশ্বরদীর ছোট বাজারটিতে আবুল কাশেম মোল্লার ছিলো চায়ের দোকান। সেই দোকানে তাঁর একটি থ্রি ব্যান্ডের রেডিওতে বিবিসির খবর শোনার জন্য অনেক মানুষ জড়ো হতেন। মুল উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের খবর জানা। যুদ্ধের সময় প্রতিদিন সন্ধ্যায় তার দোকানে অনেক মানুষ জড়োা হওয়ার খবর পেয়ে এক পর্যায়ে পাকিস্তানি বাহিনী আবুল কাশেম মোল্লাকে নির্যাতন করে পা ভেঙ্গে দিয়েছিল। সেই থেকে বেশ কয়েকটি দোকান নিয়ে গড়ে উঠা সে দিনের রুপপুর ছোট বাজারটি বিবিসি বাজার নামে পরিচিতি লাভ করে।
অনুসন্ধ্যানে জানাযায়, ১৯৭১ সাল। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প বসিয়েছে পাবনার পাকশী পেপার মিল ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এলাকায়।
পেপার মিল থেকে দক্ষিণ দিকে সামান্য পথ গেলেই রুপপুর গ্রাম। এ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন কাশেম মোল্লা। তিনি জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে পাকশী রেলবাজারে সে সময়ে গড়ে তুলেন একটি মুদি দোকান।
প্রথমত: '৭১-এর ২৫ মার্চের পরে পাকিস্তানি আর্মি বাজারটি পুড়িয়ে দিলে তিনি চলে যান নিজ গ্রাম পাকশীর রূপপুরে। নিজের হাতে লাগান একটি কড়ই গাছ। সে গাছের পাশেই পরবর্তীতে তিনি গড়ে তুলেন ছোট্ট খাটো চায়ের দোকান।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সবাই তখন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সে সময়ে তো আর এখনকার মতো ইন্টারনেট, মোবাইল এর প্রচলন ছিল না। ছিলনা রেডিও পাকিস্তানে প্রকৃত সত্য বা সঠিক কোনো খবর। তখনকার সময় খবর বলতেই বিশ্বাস যোগ্য আর বস্তুুনিষ্ঠ গণ মাধ্যম হিসেবে ছিল একমাত্র ভরসার যায়গা করে নিয়ে ছিলো ‘‘ বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা’; যদিও সেটা কলকাতার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার নির্ভর ছিলো। তথাপিও মুক্তিকামী বাঙালী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আস্থার বার্তা স্থলে পরিণত ছিল ।
বিবিসি বাজার বা গোড়াপত্তনের ইহিতাস সম্পর্কে যা জানাযায়, তা হলো একাত্তরে হানাদার বাহিনীর আগ্নেয়াস্ত্রের বাঁটের আঘাতে জখম হওয়া পা নিয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটা কাশেম মোল্লার স্ত্রী আনোয়ারা বেগমের ইচ্ছায় থ্রি ব্যান্ডের একটি রেডিও কিনেছিলেন। সে সময় পাঁচ গ্রাম খুঁজেও একটি রেডিও পাওয়া যেত না। চায়ের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় জমানোর জন্যই দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে রেডিওটি দোকানে তিনি নিয়মিত নিয়ে যেতেন। দেশে যুদ্ধ লাগার পর দেশের সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে বিবিসি বাংলায় খবর প্রচারিত হতো। ক্রমেই ভিড় বাড়তে থাকল তার দোকানে। সেই থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গড়ে উঠল তাঁর ও আত্মিক সম্পর্ক।
প্রায় প্রতিসন্ধ্যায় মুক্তিযোদ্ধারা খবর শোনার জন্য তার চায়ের দোকানে অবস্থান নিতেন। জন সাধারণের সাথে মিশে। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে
কাশেম মোল্লা তিনি রেডিও তে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর শোনাতেন। কোথায় কী ঘটলো, কারা ঘটালো, ইত্যাদি জানার আগ্রহে রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এবং বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা ও কলকাতা বেতারের খবর শোনার জন্য আশপাশের মানুষ দু'বেলা নিয়মিত তার চায়ের দোকানে ভিড় জমিয়ে চুমুক দিতো চায়ের কাপে।
আর চা দোকানী কাশেম মোল্লা এক পর্যায়ে গোপনে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের দেশীয় দোসর, রাজাকার ও পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করে দিতেন । ঝুঁকিপূর্ণ, সেই সময় মহা উৎকণ্ঠা, আশঙ্কার কথা জেনেও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভরা বাজারে বসে শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে শুনিয়েছেন বিবিসির খবর।
এক সাক্ষাৎকারে কাশেম মোল্লা বলেছিলেন, 'পাকিস্তানি সেনারা আমারে হুঙ্কার দিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালি করে বলে, তুম এধার আও, তোমহারা দোকানমে রেডিও বাজতা হায়, শ্যালে, তুমকো খতম কারদেঙ্গে, তুম রেডিও নিকালো।' সেনাদের কথায় আমার তো জানে পানি নাই। ভেবেছিলাম, মাইরে ফেলবি। আমি কলেম, ও চিজ হামারা নেহি হে, আদমি লোক খবর লেকে আতা হে, শুন লেকে চলে যাতা হে।'
সে দিন কাশেমের কথায় পাক হানাদার বাহিনী তারা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। হাতের রোলার আর রাইফেলের বাঁট দিয়ে তার পায়ে আঘাত করে। সেই থেকে মৃত্যুর আগ মুর্হুত পর্যন্ত কাশেম মোল্লার সেই পা অকেজো হয়েছিল।
মূলত: সন্ধ্যা হলেই রূপপুর গ্রামে হাঁকডাক শুরু হতো। গ্রামের লোকেরা একে অন্যকে বলত, চল 'বিবিসি শুনতে যাই'। এ ভাবে কাশেম মোল্লার চায়ের দোকানে বিবিসি খবর শোনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আরও কয়েকশ' দোকান, বিস্তার লাভ করতে থাকে পরিধি। যা দেশ স্বাধীন হওয়ার পর 'বিবিসি বা বিবিসি শোনার বাজার' এবং পরবর্তীকালে 'বিবিসি বাজার' নামে স্থায়ী নামকরণ হয়। এতে কিছু উৎসাহী লোক লন্ডনে চিঠি লিখে বিবিসি কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানায়। খবরটি জেনে ১৯৯২ সালে বিবিসির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাদের একটি দল বাংলাদেশে এসে কাশেম মোল্লার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি শ্রোতাদের সঙ্গে আলাপ করা। তারা পরিদর্শন করেন বিবিসি বাজারটিও। সে দলে ছিলেন, বিবিসির ইস্টার্ন সার্ভিস সেকশন প্রধান ভ্যারি ল্যাংরিজ, বাংলা বিভাগের তৎকালীন উপ-প্রধান সিরাজুর রহমান, ভাষ্যকার দীপঙ্কর ঘোষ এবং বিবিসির সাবেক বাংলাদেশ সংবাদদাতা প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদ।
জানাযায়, বিবিসির ইস্টার্ন সার্ভিস সেকশন প্রধান ভ্যারি ল্যাংরিজ, বাংলা বিভাগের তৎকালীন উপ- প্রধান সিরাজুর রহমান কাশেম মোল্লার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। তিনি লন্ডন থেকে কাশেম মোল্লার উদ্দেশে বেশ কয়েকটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেগুলো বেশ কয়েক হাত ঘুরে শেষ পর্যন্ত কাশেম মোল্লার কাছে আর পৌঁছেনি।
স্বাধীনতার ৪৫ বছর কেটে গেলেও তার খবর আর কেউ রাখেনি। মৃত্যুর আগ অবধি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাদানকারী হিসেবেও আবুল কাশেম মোল্লাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। না পাওয়ার ব্যথা বুকে ধরে রাখতে রাখতে এক পর্যায়ে চলে গেছেন তিনি না ফেরার দেশে। তবুও তাঁর সেই বিবিসি বাজার নাম করণ এখন সরকারি করণ হয়েছে। তারপরের কথা বলতে কাশেম মোল্লার মৃত্যু পরবর্তী কেউ আর খোঁজ নেয়নি সে পরিবারটির।
যদিও কাশেম মোল্লার নিজ হাতে লাগানো সে দিনের কড়ই গাছ আজ মহিরুহ হয়ে দাড়িয়ে আছে যেন কালের সাক্ষী হয়ে। গাছটির গতর ও বদন বেশ মোটাতাজা।
আর কাশেম মোল্লার সেই রেডিও এখনও যতœ করে রাখা আছে বাড়ির আলমারিতে। যদিও তা নষ্ট হয়েছে ২০ বছর আগে। কিন্তু সরকারিভাবে সেই রেডিও আজো সংরক্ষণ এর উদ্যেগ নেওয়া হয়নি ।