জলছত্রের আনারস
লেখাঃ গাজী মুনছুর আজিজ
বৃহঃস্পতিবার, ২৮শে এপ্রিল, ২০২২
স্বাদের জন্য মধুপুরের আনারসের সুনাম দেশজুড়ে। জৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাস এ আনারসের পূর্ণ মৌসুম। আর এ আনারস বিক্রির সবচেয়ে বড় হাট বসে জলছত্র।
সারি সারি ভ্যানভর্তী আনারস। ভ্যানের পাশাপাশি সাইকেলেও আনারস ঝুলানো আছে। টাঙ্গাইলের মধুপুরের জলছত্রের আনারসের হাট এটি। স্বাদের জন্য এখানকার আনারসের সুনাম দেশজুড়ে। সে সুনামের নমুনা দেখতেই এক শুক্রবার সকালে এখানে আসি। গাড়ি থেকে নেমে যখন হাটে পা রাখি তখন ক্রেতা-বিক্রেতায় মুখর পুরো জলছত্র। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুইপাশে জমে ওঠা এ হাটের বিস্তৃতি বেশ জায়গা জুড়ে।
সাইকেল বোঝাই আনারস নিয়ে বিক্রির অপেক্ষায় থাকা আলমগীর হোসেন বলেন, হাটের বেচাকেনা শুরু হয় খুব সকালে। চলে বিকেল পর্যন্ত। তবে হাটে যারা ভ্যানে বা সাইকেলে আনারস বিক্রি করেন, তাদের সবাই চাষি বা মহাজন নন। মূলত তারা চাষির বাগান থেকে আনারস কেটে তা হাটে এনে বিক্রি করেন এবং এজন্য প্রতি ১০০ আনারস বিক্রির জন্য ভ্যান বা সাইকেলওয়ালা পান ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। আবার অনেক চাষি বা মহাজন নিজেরাই সাইকেল বা ভ্যানে করে এনে বিক্রি করেন।
ভ্যান বোঝাই আনারস বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতি ভ্যানে ১০৫টি আনারস থাকে। তবে ১০৫ টি হলেও ধরা হয় ১০০টি। একইভাবে সাইকেলের দুইপাশেও ঝুলানো থাকে ১০৫টি আনারস। এগুলো বিক্রি হয় আকার ভেদে। সাধারণত এ হাটে বড় আকারের আনারস প্রতিটি পাইকারি বিক্রি হয় ১৬ থেকে ২১ টাকা। আবার একটু ছোট আকারের গুলো প্রতিটি বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৫ টাকা।
হাটের পাইকাররা আসেন ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে। পাইকারি ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার আলী বলেন, সপ্তাহের শুক্র ও মঙ্গলবারে বসা এ হাটে অনেক বছর ধরেই আনারস বেচাকেনা করি। আনারসের মৌসুমে এ হাট ২৫ মাইলের মোড় থেকে শুরু করে পুলিশ ফাঁড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। আর আনারস বেচাকেনার জন্য দেশের সবচেয়ে বড় হাট এটি। এখান থেকে কিনে পাঠাই ঢাকা। সিলেট, মৌলভীবাজার বা পার্বত্য চট্টগ্রামে আনারসের চাষ হলেও স্বাদের জন্য মধুপুরের আনারসের চাহিদা আছে সারা দেশেই।
বেশ কিছুক্ষণ হাটে ঘোরাঘুরি করি। কথা বলি হাটুরেদের সঙ্গে। বাজারের দোকানে গরুর দুধ দিয়ে বানানো চা খাই। তারপর ভ্যানে গ্রামের পথ ধরি আনারস বাগানের উদ্দেশে। যেতে যেতে পথে দেখি সাইকেল ও ভ্যান বোঝাই করে আনারস বিক্রেতরা হাটের উদ্দেশে আসছেন। ভ্যান থেকে নেমে কথা হলো হাটের উদ্দেশে আসা ইমতিয়াজ হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রায় ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার দূর থেকে চাষির খেত থেকে নিজেই আনারস কেটে তা সাইকেলে বোঝাই করে রওনা হয়েছেন হাটের উদ্দেশে। বিক্রি করে পারিশ্রমিক পাবেন ৩০০ টাকা। বাকি আনারসের টাকা নিজেই পৌঁছে দিবেন চাষিকে। তারসঙ্গে কথা শেষে আবার উঠি ভ্যানে।
রাস্তার দুইপাশে যেদিকেই দেখি, সেদিকেই কেবল আনারসরে বাগান। কিছুক্ষণ চলার পর অরণখোলার জাংগালিয়া গ্রামের খোদেজা বেগমের আনারস বাগানের সামনে নামি। খোজাদা বেগম বলেন, মধুপুরের প্রায় সব অঞ্চলে আনারস চাষ হয়। তবে অরণখোলা অঞ্চলে বেশি হয়। এখানকার জাংগালিয়া, মাগন্তীনগর, বেরিবাইদ, আংগারিয়া, ধরাটি, পীরগাছা, কোনাবাড়ী, নয়নপুর, সাইনামারী, মমিনপুর, মালাইদ, রাজঘাট, কুড়াগাছা, চাপাইদ, পিরোজপুর, ভবানীটেকি, পলাইটেকি, আকালিয়াবাড়ী, কাকরাইদ, গাছাবাড়ী, বংশীবাইদ, টেলকী, গায়রা, জলই, ভুটিয়া, আমলীতলা, কামারচালা, ফেকামারী, গোবুদিয়া, চুনিয়া, খানপাড়া, চিকনবাইদ, ঝাটারবাইদ, পলটপাড়া, পাটপচা, কমলবাইদ, দিগলবাইদ, ফেইটামারী, রাজাবাড়ী, ঘেচুয়া, দানকবান্দা গ্রাম, ঘোলাকুঁড়ি ও আউশনাড়া ইউনিয়নসহ এর আশপাশের গ্রামে আনারসের চাষ বেশি হয়।
জাংগালিয়ার আনারস চাষি কালাচান বলেন, আমাদের দেশে হানিকুইন, জায়েন্ট কিউ ও ঘোড়াশাল প্রজাতির আনারস চাষ হয়ে থাকে। তবে এ অঞ্চলে আগে বেশি চাষ হতো হানিকুইন বা জলডুগি আনারস। আর এখন চাষিরা বেশি চাষ করছেন জায়ান্ট কিউ প্রজাতি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এবার টাঙ্গাইলে প্রায় ৮হাজার হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়েছে। সাধারণত আমরা ফালগুন-চৈত্র মাসে আনারসের চারা রোপণ করি। স্বাভাবিকভাবে আনারসের বীজ হয় না। তাই পার্শ্ব চারা, বোঁটার চারা, মুকুট চারা ও গুঁড়ি চারা দিয়ে আনারসের বংশ বিস্তার করি। এরমধ্যে পার্শ্ব চারা বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য বেশি উপযোগী। জৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ মাসে ফল সংগ্রহের পূর্ণ মৌসুম।
চাষি রেখা বেগম বলেন, আমরা দুইরকম চারা রোপণ করি। একটা ছোট আকারের, আরেকটা বড় আকারের। বড় আকারের চারা থেকে ফল আসতে ১৮ মাস সময় লাগে। আর ছোট আকারের চারা থেকে ফল আসতে লাগে ৩৬ মাস। বাকি সময়ে আমরা আনারসের পাশাপাশি আদা বা হলুদ চাষ করি।
চাষি কালাচান তার বাগান থেকে আনারস কেটে রাস্তার পাশে স্তুপ করছেন। তারপর নিজেই হাটে নিয়ে বিক্রি করবেন। তার সঙ্গে তার বাগানে যাই। সঙ্গে তার কন্যা মাসুদা খাতুনও আছে। সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বাগানে গিয়ে কালাচান দেখান আনারসের ফুল, ফল, চারাসহ চাষের নানা বিষয়।
বাগান থেকে ফিরে বসি কালাচানের বাড়ির বারান্দায়। টিনের চালা মাটির দেয়াল। তার মা বাগান থেকে সদ্য আনা পাকা আনারস কেটে লবন আর কাচামরিচ দিয়ে মাখিয়ে দেন আমাকে। আনারস অনেক খেয়েছি, তবে এ আনারসের স্বাদ অন্য তৃপ্তি দিয়েছে। সেইসঙ্গে কালাচান পরিবারের আতিথেয়তা প্রমান করে বাঙালি সত্যিই অতিথিপরায়ণ।
আনারস খেয়ে হেঁটে রওনা হই হাটের দিকে। রাস্তার দুইপাশই বড় বড় গাছগাছালিতে ঢাকা। আসলে শালবনঘেঁষা এ এলাকার গ্রামগুলো দরুণ সবুজময়। কিছুক্ষণ হেটে ভ্যানে উঠে আসি হাটে। হাটে বেচাকেনা চলছে। পাইকাররা আনারস কিনে ট্রাক বা পিকআপ ভ্যানে তুলছেন। পাইকারির পাশাপাশি খুচরাও বিক্রি চলে। কেটে কেউ কেটেও বিক্রি করেন। অনেক ক্রেতা সদ্য বাগান থেকে আনা পাকা আনারস কিনে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুরও তোলেন।
প্রয়োজনীয় তথ্য : ঢাকার মহাখালী থেকে বিনিময় বাস মধুপুরের উদ্দেশে ছেড়ে যায় সকাল থেকে মধ্যরাত। মধুপুর নেমে অটো রিকশায় বা প্রান্তিক বাসে জলছত্র যাওয়া যাবে। এছাড়া নিরালা, সকাল-সন্ধ্যাসহ বিভিন্ন এসি/ননএসি বাস যায় টাঙ্গাইল। সেখান থেকে আবার লোকাল বাসে যাওয়া যাবে জলছত্র। খাওয়ার জন্য জলছত্র হাটে রেস্টুরেন্ট আছে। থাকার জন্য মধুপুর শহরে হোটেল পাবেন।
ছবি : লেখক