১৯১৯ সালে অবকাশ যাপনের জন্য তখনকার আসাম রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯১৯ সালের ১১ অক্টোবর তিনি শিলং পৌঁছান। সেখানে ২০ থেকে ২২ দিন অবস্থান করার পর সিলেট ভ্রমণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। শিলং থেকে সিলেট মাত্র ১৪০ কিলোমিটারের পথ হলেও তখন সিলেট পর্যন্ত সরাসরি রাস্তা ছিল না। বিকল্প পথ গুয়াহাটি থেকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লামডিং-বদরপুর সেকশন হয়ে করিমগঞ্জ-কুলাউড়া হয়ে সিলেট আসতে হয় তাঁকে। অনেকটা দীর্ঘ ছিল এই পথ। ১৯১৯ সালের ৫ নভেম্বর, দিনটি ছিল বুধবার। খুব ভোরে সিলেটে পৌঁছান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সঙ্গে ছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী। সুরমা নদীর ঘাট থেকে কবিকে শঙ্খধ্বনি বাজিয়ে শোভাযাত্রাসহ সিলেট শহরে আনা হয়। তিনি উঠেছিলেন শহরের নয়াসড়ক টিলার ওপরে ফাদার টমাসের বাংলোয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় কবিকে টাউন হল প্রাঙ্গণে শ্রীহট্টবাসী জনসাধারণের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা জানানো হয়। সৈয়দ মুর্তজা আলীর একটি লেখায় (আমাদের কালের কথা, চট্টগ্রাম, ১৩৮২) উল্লেখ আছে, ওই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ। সেই অনুষ্ঠানে কবি দেড় ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা করেন, যা পরে ১৩২৬ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় ‘বাঙালির সাধনা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। বেলা দুইটার সময় ব্রাহ্মসমাজ গৃহে শ্রীহট্ট মহিলা সমিতি কর্তৃক তাঁকে সম্মাননা জানানো হয়। অনুষ্ঠানস্থলে কবির টেবিলে মোড়ানো ছিল মণিপুরি মেয়েদের তৈরি টেবিল ক্লথ। কাপড়খানি তাঁর ভালো লাগে। মেয়েদের বয়ন-নৈপুণ্য দেখে কবি মণিপুরিদের তাঁত ও জীবনযাত্রা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পড়ছিলাম বই এর পাতা থেকে। এর পর থেকে শুধু পরিকল্পনাই করছিলাম গুরুদেবের স্মৃতি বিজড়িত মাছিমপুরে মনিপুরি পাড়ায় ঘুরে আসবো। কিন্তু বিধি বাম হলে যা হয় যবো যাবো বলে যাওয়া হচ্ছিলনা। এদিকে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত মাছিমপুর মণিপুরী পাড়ায় কবিগুরুর আবক্ষ মূর্তি স্থাপিত হয়েছে শুনে ঐ স্থানে যাওয়া আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। যাই হোক সূর্যদেবের অশেষ কৃপায় আমি আর আমার এক সঙ্গী কে নিয়ে বের হয়েছি গন্তব্য মাছিম পুরের দিকে। দিবা দ্বিতীয় প্রহর তাই সূর্যদেবের প্রখরতা ও বেশ বেশী। এর মাঝেও আমরা আমাদের কুটির থেকে ত্রিচক্র যান করে এগিয়ে যাচ্ছি। জিন্দাবাজার ,বন্দরবাজার পেড়িয়ে আমরা ধাবিত হচ্ছি মাছিমপুরের দিকে। মাছিমপুরের সেই ছোট বেলায় গিয়েছিলাম বাবার সাথে করে । সময়ের ধারাপাতে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে তাই পথ গুলো নতুন মনে হচ্ছিল বৈকি। ভ্রমণ স্থানে নিয়ে যাওয়ার ত্রিচক্র যান এর কাণ্ডারি মহদয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ঘড়ির কাঁটার সাথে পাল্লা দিয়ে আমরা এসে পৌছালাম মাছিমপুরে । এখন কোন দিকে যাবো সেই পথ টাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। নিরুপায় হয়ে এক প্রবীণের শরণাপন্ন হতে হলো। তার কথা মত আমরা পৌঁছে গেলাম রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত মাছিম পুরের মনিপুরি পাড়ায়। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সুরমা নদী। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের আবক্ষ ভাস্কর্য। দেখে মন ভরে গেলো। মনে মনে ভাবছিলাম এই স্থানেই একদিন পা দিয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নখত্র সবার প্রিয় কবি কবি গুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর।আমি ঠায় কিছু সময় দাঁড়িয়ে রইলাম। পাশেই দেখতে পেলাম মন্দিরের। মনে মনে  ভাবছিলাম এই মন্দিরেও নিশ্চয়ই গুরুদেবের পদ ধুলি পড়েছিল। আমি মনে মনে খুঁজছিলাম কারো কাছ থেকে যদি পুরো ইতিহাস তা জানা যেতো। দেখা হলো কবি ও গবেষক এ কে শেরাম দাদার সাথে। তার কাছে ইতিহাস জানতে চাইলে তিনি বলেন ৬ নভেম্বর বিকেল তিনটার দিকে মাছিমপুর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি বস্তিতে আসেন কবি গুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর। মণিপুরি বস্তিতে কবির আগমন ঘটবে, এ জন্য বস্তিবাসী তাৎক্ষণিকভাবে রাস্তায় সারি সারি কলাগাছ পুঁতে তোরণ নির্মাণ করেন। প্রতি গাছের গোড়ায় মঙ্গলঘট ও আমপাতার শোভন সজ্জা করেন। সে তোরণদ্বার দিয়ে কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় মাছিমপুর পূর্বমণ্ডপের গোপীনাথ জিউ মন্দিরে। কবির উদ্দেশে মণিপুরি ছেলেমেয়েরা রাখালনৃত্য পরিবেশন করে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম নিয়ে রাখাল নৃত্যের কাহিনি। এটি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরিদের পার্বণিক আচারেরই অংশ।ঐ মণ্ডপ টি  এখনো বর্তমান আছে।কবির ইচ্ছা ছিল রাসনৃত্য দেখার, কিন্তু ক্লান্ত বোধ করায় মণিপুরি ছেলেমেয়েদের সন্ধ্যায় তাঁর বাংলোয় আসতে বলেন। তিনি আসার সময় মণিপুরি মেয়েদের তৈরি তাঁতের কাপড় কিনে নিয়ে আসেন। সেই রাতে মাছিমপুর বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি বস্তি থেকে একদল শিল্পী ফাদার টমাসের বাংলোয় পৌঁছান। শিল্পীরা মণিপুরি রাসলীলার কিছু গীতি ও নৃত্য কবির সামনে উপস্থাপন করেন। সেদিন কবিগুরু মণিপুরি নৃত্যের সজ্জা, সাবলীল ছন্দ ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হন এবং শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েদের এই নৃত্য শেখানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এ কে শেরাম  দার কথা চলছে আর আমরা পদব্রজে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দাদার কথা গুলো শুনে সেই সময়কার কথা গুলো চোখে ভেসে উঠলো। ইস! আবার যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফিরে আসতে আমাদের মাঝে।আমরা মাছিমপুর এলাকা টা ঘুরে দেখতে লাগলাম। নগর জীবনের ছোঁয়ায় নেই সেই মনিপুরিদের আগের কোমড় তাঁত।তবে কবি গুরুর পদ ধুলি প্রাপ্ত সেই মন্দির আজ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা মন্দিরে গিয়ে কিছু সময় বসলাম।মনিপুরি সম্প্রদায়ের দেবালয়ের গঠন প্রায় সব জায়গায় একই। প্রতিটি মন্দিরের পাশে শিবমন্দির থাকে এখানেও তার বেতিক্রম দেখলাম না। তাছাড়া মনিপুরি সম্প্রদায়ের প্রতিটি বাসার সামনে তুলসি মন্দির দেখতে পেলাম যা নগর জীবনে খুব একটা দেখতে পাওয়া যায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কল্যাণে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা মণিপুরি নৃত্যের বিশ্বময় প্রচার হতে থাকে।  গত শতকের তৃতীয় দশক থেকে মণিপুরি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটতে থাকে। মণিপুরি নৃত্যগুরু ও শিল্পীরা সমাদৃত হতে থাকেন এবং বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোতে তাঁরা আমন্ত্রিত হতে থাকেন। কেবল ধর্মীয় আচারের জন্য পালিত সংস্কৃতি অর্থকরী হিসেবে পরিগণিত হতে থাকে মণিপুরি সমাজে। মণিপুরি সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ অসামান্য ভূমিকা রাখার জন্য মণিপুরি সম্প্রদায় আজও কবিগুরুকে ‘মণিপুরি নৃত্যের পথিকৃৎ’ হিসেবে বিবেচনা করেন। মণিপুরি নৃত্যগুরুরা আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করেন কবিগুরুর নাম। । উল্লেখ্য যে আসছে  নভেম্বরের ৫ তারিখে সিলেটে কবিগুরুর আগমনের শত বছর পূর্তি হচ্ছে।

যাবেন কিভাবেঃ

ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে অথবা ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্তনগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনী এবং রাতে উপবন সিলেটের পথে ছোটে ভাড়া ৩৬০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে । সেখান থেকে মাছিমপুর মণিপুরী পাড়ায় যেতে ভাড়া নেবে ৪০ টাকা, সিএনজি অটোরিকশা  ভাড়া ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।

লেখা ও ছবি - সুমন্ত গুপ্ত , ০১৭১৭৬৭৪৩১০