তাড়াশের দইমেলা
লেখাঃ উদয় শংকর বিশ্বাস
বুধবার, ১লা জুন, ২০২২মেলার দেশ বাংলাদেশ। প্রতিনিয়ত কত মেলা হয় তার কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসেব নেই। বেসরকারি এক হিসেব মতে, বছরব্যাপী দেশজুড়ে হাজারের উপরে মেলা অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা যায়। গ্রামীণ মানুষের বিকিকিনি ও বিনোদনের খোরাক মেটাতে দেশের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন উপলক্ষ্যে অসংখ্য মেলা সারা বছরজুড়ে বসে। এমন জনপদ খুঁজে পাওয়া মুশকিল যেখানে মেলার কোনো অস্তিত্ব নেই। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা এমন কেউ নেই যার মন মেলার কথা শুনে নেচে না ওঠে। বারো মাস তেরো পার্বণের এই বাংলাদেশে সারা বছরই মেলা বসে, তবে শীতকালে এর মাত্রাটা একটু বেশি হয়ে থাকে। শীত হলো মেলার জন্য উত্তম সময়। তাই আমি প্রতিবছর শীতে বেড়িয়ে পড়ি দেশের নানা অঞ্চলের গ্রামীণ মেলার হালহকিকত জানার জন্য।
এবার যাচ্ছি ভিন্ন এক মেলা দেখতে। মেলাটির নাম ‘দইমেলা’। সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলায় এক দিনের ব্যতিক্রমধর্মী মেলাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে অনেক দিন ধরেই। মাছের মেলা, ঘুড়ির মেলা, বউমেলা, জামাইমেলার মতো একক এই দইমেলার কথা খুব বেশি লোকের জানা নেই। শুধু দই নিয়ে যে একটি মেলা হতে পারে তা আমার আগে জানা ছিল না। তাই অজানা ও অভিনব দইমেলা দেখার মনস্কামনা পূরণের জন্য বেরিয়ে পড়ি এক ভোরে।

আগেই জেনে নিয়েছি তাড়াশে যাবার পথের হদিস। যোগাযোগ খুব সহজ, বাসে ঢাকা থেকে সরাসরি তাড়াশে যাওয়ার উপায় নেই। যেতে হয় কিছুটা ভেঙে। কল্যাণপুর থেকে রাজশাহীগামী ন্যাশনাল ট্রাভেলসের ভোরের গাড়িতেই রওনা হই দইমেলার উদ্দেশে। মাঘের শীত নাকি বাঘের গায়ে লাগে। এবার অবশ্য মাঘেও খুব একটা শীত নেই। এখন যেন শীত আর শৈত্যপ্রবাহ এক হয়ে গেছে। শৈত্যপ্রবাহ থাকলেই বোঝা যায় শীত বলে আমাদের বুঝি একটা ঋতু আছে! উত্তরবঙ্গের চিরাচরিত শীতের কথা ভেবে আগেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু তা খুব বেশি কাজে আসে নি।
যমুনা সেতু পার হয়ে হাটিকুমরুল মোড়ে যাবার পরও সূর্যের দেখা পেলাম না। চতুর্মুখ এই মোড়ে রাস্তা তিন দিকে ভাগ হয়ে গেছে। এক দিকে বগুড়াসহ রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলো, আরেক দিকে পাবনা সদর এবং সোজা নাটোর-কুষ্টিয়ামুখী বনপাড়ার রাস্তা। এই বনপাড়া রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে পড়ে মহিষলুটি মোড়। তাড়াশ যাওয়ার জন্য আমাকে এখানেই নামতে হবে। বাসটি যখন মহিষলুটি এসে পৌঁছাল, তখন ঘড়িতে বাজে নটা। বাস থেকে নেমে মোড়ের সাধারণ হোটেলে সেরে নিই সকালের জলযোগ। এরপর ভটভটির জন্য খানিক অপেক্ষা। তাড়াশে যাওয়ার সহজ বাহন এই ভটভটি। এই বাহন ছাড়া বাসেও যাওয়া যায়, কিন্তু বাসের দেখা মেলা সহজ নয়। সময় ক্ষেপণ না করে ভটভটির সামনের আসনে উঠে বসি। চৌদ্দ জনের আসন ভরতে সময় নিল আধঘণ্টা। মাঝারি গতিসম্পন্ন ভটভটির ভাড়া জনপ্রতি দশ টাকা।
আঁকাবাঁকা পথ মাড়িয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যে পৌঁছাই তাড়াশ উপজেলার তাড়াশ বাজারে। তাড়াশ বিখ্যাত চলনবিলের অংশ। সিরাজগঞ্জের এই উপজেলাটি এককালে ডাকাতের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। অনেককাল পর্যন্ত চলনবিলের কর্তৃত্ব তাড়াশের ডাকাতদের হাতে ন্যস্ত ছিল বলে তাড়াশের ডাকাতি নিয়ে অনেক কিংবদন্তী, লোককাহিনি প্রচলিত আছে এ-অঞ্চলের মানুষের মধ্যে। সেসব আজ ইতিহাস। ডাকাতি-ফাকাতির কথা বাদ দিয়ে অনুসন্ধান করলাম দইমেলার স্থান সম্পর্কে। বেশি অনুসন্ধান করতে হলো না, ভটভটি স্ট্যান্ডের কাছেই উপজেলা সদরের রশিকরায় মন্দিরমাঠেই বসেছে অভিনব মেলাটি।
প্রতিবছর মাঘ মাসের শ্রীপঞ্চমী তিথির দিনে বসে এক দিনের এই মেলা। তাড়াশের জমিদারবাড়ির প্রাঙ্গণমাঠ স্থানীয়দের কাছে রশিকরায় মাঠ নামে পরিচিত। পুরো মাঠ জুড়ে দই আর দই। হরেক রকমের ডালিতে পসরা সাজিয়ে বসেছেন দই বিক্রেতারা। কেউ কেউ আবার চেয়ার-টেবিল পেতে বসেছেন। আশপাশের বিভিন্ন জেলার ঘোষেরা এসেছেন এখানে তাদের বানানো দই বিক্রি করতে।

চলনবিলের দুধের খ্যাতি দেশজুড়ে। দেশের সবচেয়ে ভালো দুধ উৎপাদন হয় পাবনা-সিরাজগঞ্জে। জানা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদেশ থেকে উন্নত জাতের গাভি এনেছিলেন এবং সেগুলো এখানকার কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। সেই গাভিদের বংশধরেরাই আজকে জোগান দিচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের দুধের চাহিদার অধিকাংশ। চলনবিল অঞ্চলে প্রচুর ঘোষ পরিবারের বসবাস, তাঁরাই তৈরি করেন হরেক রকমের দই-মিষ্টি। দেশখ্যাত বগুড়ার দইও তৈরি হয় এই দুধ থেকে। দইমেলায় কথা হলো বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ঘোষদের সঙ্গে। বেশিরভাগ দই বিক্রেতা এসেছেন বগুড়ার শেরপুর থেকে; বগুড়ার দই বলতে শেরপুরের দইকেই সবাই বোঝেন। বগুড়ার দইয়ের খ্যাতি সারা দেশজুড়ে।
পুরো মাঠ জুড়ে শুধু দই আর দই। যেদিকে তাকানো যায় সেদিকেই চোখে পড়ে দইয়ের শত শত ক্রেতা-বিক্রেতার আনাগোনো। হরেক রকমের দই দেখে অভিভূত হয়ে যেতে হয়। দইয়ের রং, স্বাদ, ভাঁড়ের আকৃতির উপরেই নির্ভর করে দইয়ের দরদাম। বিভিন্ন দামের দই বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। ক্রেতা সাধারণ সাধ্যানুসারে দই কিনছেন পরিবারের জন্য। সর্বনিম্ন দর প্রতি কেজি পঞ্চাশ টাকা, আর ঊর্দ্ধে দুইশত টাকা। ভাঁড়ের থেকে আবার টালি দইয়ের দাম বেশি।
সবার দই কেনা দেখে আমি আর বসে থাকতে পারলাম না; পরিবার না থাকায় চেখে দেখার জন্য কিনলাম কাপ দই। স্বাদ মন্দ নয়, রং দেখে যা মনে হয়েছিল তেমন নয়, তবে মান অনেক ভালো। ঘোষেরা জানালেন, তারা দইয়ে কৃত্রিম রং খুব একটা ব্যবহার করেন না বলে এখানকার দই দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয় নয়। দুপুরের মধ্যে বিক্রি হয়ে গেল মেলায় আসা অধিকাংশ দই। দুপুরে সরস্বতী পূজার সময়ে বেচাকেনা কিছুটা কম থাকে। বিকালে আবার জমে।
শ্রীপঞ্চমী তিথি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এ-তিথিতেই শিক্ষার্থীরা ভক্তিসহকারে মা সরস্বতীকে প্রদান করে পুষ্পাঞ্জলি। তাড়াশের লোকজন সরস্বতী মায়ের পূজায় ভোগ হিসেবে ফলমূলের পাশাপাশি নিবেদন করেন তাঁদের বাড়িতে বানানো অথবা দইমেলা থেকে কেনা দই—এটাই এখানকার রীতি। এসময়ে দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনরা আসেন কুটুমবাড়িতে। জামাইয়েরা দই কেনেন শ্বশুরবাড়ির জন্য। চিড়া-মুড়ির সঙ্গে সকালে সব বাড়িতে খাওয়া হয় দই-চিড়া। এটা এখানকার অনেক দিনের ঐতিহ্য। জানা যায়, তাড়াশের জমিদার বানোয়ারী লাল রায়বাহাদুর প্রথম প্রচলন করেছিলেন এই মেলার। তিনি তাঁর এলাকার ঘোষদের হাতের দই-মিষ্টি খেতে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর সময়ে যেকোনো উৎসবে দই-চিড়া খাওয়ানোর বিশেষ রীতি ছিল।
সরস্বতী পূজা উপলক্ষ্যে সাত দিনব্যাপী মেলাও হতো এখানে। দইমেলায় আগত ঘোষদের মধ্য থেকে একজনকে বানোয়ারী লাল নিজে পুরস্কৃত করতেন বলে জনশ্রুতি আছে। পুরস্কারের আগ্রহে ঘোষদের আগমনে ধীরে ধীরে মেলার পরিধি বাড়তে থাকে। মেলার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। দইমেলার প্রচলন যদিও বানোয়ারী লাল রায়বাহাদুর করেছিলেন, কিন্তু বারোয়ারি এ-মেলার কর্তৃত্ব অল্প দিনের মধ্যে চলে যায় জনসাধারণের হাতে। আজও মেলার কর্তৃত্ব এলাকার মানুষের হাতেই। মেলার আগের জৌলুস এখন আর নেই বলে স্থানীয়রা জানালেন।
মেলায় আগত দর্শনার্থীরা জানালেন, দইয়ের মান ক্রমশ নিম্নমুখী। এর কারণ হিসেবে তাঁরা দায়ী করলেন ঘোষদের অসাধুতাকে। আর ঘোষেরা দায়ী করলেন দুধের অপ্রতুলতাকে, সেইসঙ্গে হাইব্রিড গরু ও গোখাদ্যকে। আগে ঘোষেরা যত উন্নতমানের দই প্রস্তুত করতে পারতেন এখন তা আর পারছেন না বিভিন্ন কারণে। দেশি গরুর দুধের স্বাদ হাইব্রিড গরুর দুধের স্বাদ থেকে ভিন্ন। অধিকাংশ গরুকে মোটা-তাজা করার জন্য হাইব্রিড খাবার খাওয়ানো হয়। এসব বহুবিধ কারণে আগের মতো ভালো মানের দই পাওয়া যায় না বলে দই প্রস্তুতকারী ও বিক্রেতারা জানালেন।
দইকাহন শুনতে শুনতে দুপুর গড়িয়ে এল। বাজারের হোটেলে দুপুরের আহার পর্ব সম্পন্ন করার সময়ে জানা গেল স্থানীয় আরেক কিংবদন্তী—বেহুলার কূপ ও নৌকার কথা। রোমাঞ্চকর কাহিনী শুনে জায়গাটিতে যাবার লোভ আর সংবরণ করতে পারলাম না।
উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার উত্তরে বারুহাঁসের কাছে আছে কথিত বেহুলাপাড়া। এই বেহুলার পাড়াতেই আছে বেহুলার কূপ ও নৌকা। তাই বারুহাঁস যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। বাজারের একপ্রান্তে পাওয়া গেল ভাড়ার মোটরসাইকেল। স্থানীয় যুবকেরা নতুন কর্মসংস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে মোটরসাইকেল চালানোর এই পেশা। এমন একজনকে সঙ্গে করে রওনা দিলাম বারুহাঁসের দিকে। কিছুক্ষণ চলার পর পথে পড়ল বিনসাড়া বাজার। বাজারকে পাশে রেখে পশ্চিম দিকের সরু রাস্তা ধরে খানিকটা এগোতেই পেয়ে যাই বিনসাড়া দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠ। স্কুলের একপাশে বাঁধানো বিশাল কূপ সহজেই চোখে পড়ল। কূপের দেয়াল অনেক উঁচু। অবাক লাগল কূপের নির্মাণকৌশল দেখে। একটা কূপের মধ্যে চারটা কূপ, অদ্ভুত! এরকম কূপ আগে দেখি নি।
কূপ দেখা শেষ করার পরে মোটরসাইকেল চালক আমাকে নিয়ে গেলেন কথিত বেহুলার নৌকার কাছে। ধানী জমির মধ্যে নৌকাকৃতি বড় একটা ফাঁকা জায়গা চোখে পড়ল। সবাই একে বেহুলার নৌকা বলে জানে। স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাস, এখানেই এসে ডুবেছিল বেহুলার নৌকা। সে-কারণে এখনো এ জায়গা হিন্দু-মুসলিম সকলেরই অসীম শ্রদ্ধার। বেহুলার নৌকা ডুবেছিল কি না জানা না গেলেও, পুরো এলাকায় ইটের কুচি দেখে সহজেই অনুমান করা যায় এ-এলাকার প্রাচীনতা সম্পর্কে। পুণ্ড্রবর্ধন বা মহাস্থানগড় এখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। হতেও তো পারে এখানেই লুকিয়ে আছে মহাস্থানের ন্যায় প্রাচীন কোনো জনপদ, কে জানে তা! এসব দেখে বিকেলে ফিরে আসি তাড়াশ বাজারে। তখন মেলা আরও জমে উঠেছে। খানিকক্ষণ ঘোরাফেরা করে পুনরায় ফিরে আসি আপন ঠিকানায়।
কীভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন : হানিফ, ন্যাশনাল ও শ্যামলী পরিবহনের বাসে হাটিকুমরুল-বনপাড়া মহাসড়কের মহিষলুটি মোড়ে নেমে, ভটভটি ধরে সহজেই যাওয়া যায় তাড়াশ উপজেলায়। বাসভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা এবং ভটভটি ভাড়া ১০ টাকা। দুপুরে খাবার খাওয়া যাবে তাড়াশ বাজারে। এখান থেকে বেহুলার নৌকা ও কূপ দেখতে হলে যেতে হবে বারুহাঁসে। ভাড়া মোটরসাইকেলে আসা-যাওয়া ৫০ টাকা। তাড়াশে আবাসিক হোটেল নেই, কিন্তু আগে থেকে যোগাযোগ করে গেলে থাকা যাবে উপজেলা ডাকবাংলোতে।