রামরাবণের বাঁশের শিল্প

লেখাঃ মাসুম সায়ীদ

রবিবার, ২৬শে মার্চ, ২০২৩

গ্রামের ভেতর দিয়ে পিচঢালা পথ। চলে গেছে সোজা পুবে-পশ্চিমে। রাস্তার সঙ্গে সঙ্গে বাঁশঝাড়। বাঁশঝাড়ের নিচে একটি মুদি দোকান। দোকানের সামনের খালি জায়গায় একটি টিনের অস্থায়ী চালা। চালার নিচে নিবিষ্ট মনে কাজ করছিলেন এক লোক।পিঠের ছোট্ট ব্যাগ নামিয়ে তার পাশে বসলাম। না, চা টা খাওয়ার জন্য নয়। উদ্দেশ্য, লোকটির কাজ দেখা। সূর্য তখনও বাঁশবনের মাথায় ওঠে নি। নরম তির্যক আলো বাঁশবনে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে এসে পড়ছে লোকটির মুখে। নাম তাঁর প্রাণগোপাল দাস। বাঁশের শিল্পী। এখন মাথালের চাক বাঁধছেন।

আগে গাঁয়ের মানুষ বাড়িঘর ও আসবাবপত্র নিজেরাই বানিয়ে নিত। বেশিরভাগই তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে। এটি গরিব মানুষের কাঠ। গ্রামের নাম রামরাবণ, ধামরাই উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নে। সেই গ্রামের ঋষিপাড়া রাস্তার ধারেই। দাস পদবির এই ঋষিরা বংশ পরম্পরায় জড়িয়ে আছে বাঁশ-শিল্পের সঙ্গে। পাড়ায় বসতি ৭০-৮০ ঘর লোকের। দু-একটি ঘর ছাড়া বাকি সবাই এখনও বাঁশের কাজ করে।

বসন্তরঞ্জন দাস এ-পাড়ারই লোক ছিলেন। তাঁর তিন ছেলে। বড় অরুণ, ছোটো ভূষণ আর মেঝো ওই প্রাণগোপালকে রেখে গত হয়েছেন। বাবার মতো ছেলেরাও হয়েছেন বাঁশের শিল্পী। ছেলেরা বাঁশের কাজের সঙ্গে খুলেছেন মুদি দোকান। এটুকুই ফারাক। একান্নবর্তী পরিবার। তিন ভাই মিলে কাজ করেন। আর বউরাও হাত লাগান ঘরের কাজ সেরে। শুধু তাঁরা নয়, এ গাঁয়ের সবাই তা-ই করে। এটাই রেওয়াজ। স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে—সবাই বাঁশের কাজ করে অবরে-সবরে।

গ্রামে বাঁশ দিয়েই সব হতো—যুদ্ধাস্ত্র থেকে ভাতের খুন্তি পর্যন্ত! বাদ পড়ত না মাছ ধরা ও কৃষিকাজের যন্ত্রপাতিও। রোদ-বৃষ্টির কামড় থেকে রক্ষাকারী ‘মস্তক আচ্ছাদন’ও হতো বাঁশের তৈরি; নাম তাঁর মাথাল। এটি, এমনকি পিঠ ছাড়িয়ে লম্বায় হাঁটু পর্যন্ত হয়। মাঠের কাজে গ্রামের মানুষের মাথালই ভরসা। হাল বাওয়া, রোয়া গাড়া আর নিড়ানি—সকল সময়ে। মাথার সঙ্গে এঁটে থাকে বলে এর নাম মাথাল। পশ্চিমা বুশ হ্যাটের সঙ্গে কোনো পার্থক্য নেই মাথালের। কানার দুপাশ থেকে বুশ হ্যাটে একটা মোটা কর্ড (দড়ি) থাকে—চোয়ালের দুই পাশ দিয়ে নামিয়ে—থুতনির নিচে কষে বাঁধার জন্য। মাথালেরও তাই। তফাতটা শুধু উপকরণে। বুশ হ্যাট ক্যাম্বিস, গ্যাবার্ডিন কিংবা জিন্স জাতীয় মোটা কাপড়ে তৈরি হয়। মাথাল বানানো হয় বাঁশে। যদিও সব হ্যাট পুরোপুরি পানি-নিরোধক হয় না। কিন্তু মাথাল থেকে পানি চোয়ানোর জো নেই।সব ধরনের বাঁশে কিন্তু মাথাল হয় না। এর জন্য দরকার হয় মাখলা বা তল্লাজাতীয় বাঁশ। এই বাঁশ যেমন নমনীয়, তেমনি মজবুত। তবে স্থায়িত্ব নির্ভর করে বাঁশের পক্বতার ওপর। একটা মাথালের স্তর থাকে চারটি। দুটি বাঁশের আর দুটি পাতার। ওপরে আর নিচে থাকে বাঁশের দুটি স্তর। পাতার স্তর দুটি থাকে ভেতরে পর পর। এর কাজ রোদের তাপমাত্রা শুষে নেওয়া আর বৃষ্টির পানি আটকে দেওয়া।

মাথালের জন্য সবচেয়ে ভালো বট আর কাঁঠালপাতা। তবে বিকল্প হিসেবে কলাপাতা, মেহগনি ও সেগুনের পাতাও ব্যবহার করা যায়। গাছ থেকে পাতা পেড়ে রেখে দিতে হয়। কাঁচা পাতা শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেলে ব্যবহার করা হয় মাথালে। বাঁশের স্তর দুটি বানানোর জন্য প্রথমে মাপমতো বাঁশ খণ্ড করে কেটে চিরে নিতে হয়। তারপর চেঁছে সমান করে খণ্ডগুলো থেকে খুব পাতলা করে তুলতে হয় বেতি। সেই বেতি ইঞ্চিখানেক ফাঁক রেখে বুনিয়ে নিতে হয়। বুনানো শুরু করতে হয় একদম ওপর থেকে। তারপর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে গোল করে তোলা হয় ঠোঙার মতো। মাপমতো বুনানো হয়ে গেলে পাতলা বেতিগুলোর বাড়তি অংশ কেটে সমান করা হয়।

এরপর প্রান্ত ঘেঁষে লাগানো হয় চাক। চাকও থাকে দুটি। ওপরে আর নিচে। চাক বানাতে হয় বাঁশের বেতি দিয়ে। এই বেতি একটু পুরু। সোয়া থেকে দেড় ইঞ্চি পাশ। গোল করার সুবিধার্থে বেতিগুলোকে চিরে নিতে হয়। চাকের সঙ্গে ছাউনিটাকে মজবুত করে আটকানোর জন্য কাঠির মতো আরো পাঁচ টুকরো বেতি গুঁজে দেওয়া হয় চারদিক থেকে। কাঠিগুলোর ওপরের প্রান্ত লাগানো থাকে একসঙ্গে মাথালের চূড়ায়। কয়েকটি পাতলা বেতি চূড়ায়ও গুঁজে দেওয়া হয়, যাতে পানি ঢুকতে না পারে। কাঠির অন্য মাথাগুলো বাঁধা পড়ে চাকের সঙ্গে।

প্রাণগোপাল আর তাঁর ভাইয়েরা এখন শুধু মাথালই বানান। বাঁশের সব কাজই জানেন প্রাণগোপাল। তাঁর ভাইয়েরাও। ঝাঁকা, ঢাকি, ধামা, কুলা, ডুলা বা খালই, ঘরের সিলিং, পার্টিশন—সব। একসময় এসব তৈরি করতেন, বিশেষ করে বাবা বসন্ত দাস যত দিন ছিলেন বেঁচে। এখন মানুষ ঘরবাড়ি বানায় টিন, কাঠ, ইট-সিমেন্ট-রড আর বালি দিয়ে। বাঁশের কাজের মধ্যে এখন ঝাঁকার চাহিদা টুকটাক আছে। ধামা আর মাথালটা চলে শুধু ধানের মৌসুমে। ফরমাশ আসে অগ্রিম; বাড়ি থেকেও বিক্রি হয়। একটি পূর্ণ বাঁশে ১০ থেকে ১২টি মাথাল হয়। সপ্তাহে বাঁশ কেনা হয় ১০টা। তিন ভাই মিলে কাজ করেন। ১০টা বাঁশে ১২০ থেকে ১৩০টি মাথাল হয়। পাইকারি দাম প্রতিটি ৩০ টাকা। খুচরা বিক্রি করলে পান ৪০ থেকে ৫০ টাকা।